নির্বাচনী প্রচারণা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রার্থীদের প্রচার–মাইক ছড়িয়ে পড়েছে অলিগলি থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকা, বাজার ও হাসপাতালসংলগ্ন সড়ক পর্যন্ত। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, উচ্চ শব্দের মাইক ও সাউন্ড সিস্টেমে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন সংস্কৃতিকর্মী সাইদ খান সাগর। এ সময় নির্বাচনী প্রচারণার মাইকের তীব্র শব্দে তিনি অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত জাতীয় জরুরি সেবা হটলাইন ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ এসে মাইক বন্ধের ব্যবস্থা নেয়।
সাইদ খান সাগর বলেন, নির্বাচনী শব্দদূষণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাত ৮টার পর মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে সেটি কেউ মানছে না। তিনি বলেন, ‘আমি বাধ্য হয়ে ৯৯৯-এ সহযোগিতা চেয়েছি। পরে পুলিশ এসে সেটি বন্ধ করে দেয়।’
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় শব্দদূষণ দীর্ঘদিন ধরেই নাগরিক দুর্ভোগের অন্যতম কারণ। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অবিরাম মাইকিং, প্রচারগাড়ি থেকে উচ্চ শব্দের গান ও স্লোগান সেই দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আবাসিক এলাকা ছাড়াও বাজার, সরকারঘোষিত নীরব এলাকা ও হাসপাতালগুলোও শব্দদূষণের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন আচরণ বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, প্রচারণায় মাইক, সাউন্ড সিস্টেম ও লাউডস্পিকারের ব্যবহার বেলা ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা। এ ছাড়া প্রচারণায় ব্যবহৃত শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রের মাত্রা ৬০ ডেসিবলের বেশি হওয়ার কথা নয়। একই সঙ্গে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, সরকারঘোষিত নীরব এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় মাইক ও লাউডস্পিকারের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত ও অফিস এলাকার ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা ঘোষণা করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।
তবে বাস্তবে এসব বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। গুলশান-১ এলাকার বাসিন্দা শাহ রাফায়েত চৌধুরী বলেন, সরকারঘোষিত নীরব এলাকা হলেও প্রতি কয়েক মিনিট পরপর উচ্চ শব্দে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। কখনো অটোরিকশা, কখনো রিকশায় মাইক বেঁধে প্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শুধু গুলশানে নয়, আমার অফিস নিকেতনে, সেখানেও একই অবস্থা।’
নির্বাচনী আচরণবিধিতে শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা ৬০ ডেসিবল নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে শব্দের মাত্রা দ্বিগুণেরও বেশি পাওয়া যাচ্ছে। বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন স্টাডিজের গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা ১২০ থেকে ১৩০ ডেসিবল পর্যন্ত পাওয়া গেছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আমিনবাজার, উত্তরা, টঙ্গী, কেরানীগঞ্জ, খিলগাঁও, ধানমন্ডি, শান্তিনগর, মালিবাগ ও পুরান ঢাকায় একই চিত্র দেখা গেছে।
ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, স্বাভাবিক সময়ে আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা ৮০ থেকে ৯০ ডেসিবলের মধ্যে থাকত। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর সেটি বেড়ে গড়ে ১২০ থেকে ১৩০ ডেসিবলে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, একদিকে নির্বাচন কমিশন শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দিলেও অন্যদিকে মাইক ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে, যা একধরনের স্ববিরোধিতা। তাঁর মতে, পোস্টার নিষিদ্ধের মতো নির্বাচনী প্রচারণায় মাইক ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা উচিত।
হাসপাতাল এলাকাতেও শব্দদূষণের প্রভাব স্পষ্ট। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, মাইক ব্যবহার করে নিয়মিত নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। রোগী ও স্বজনেরা এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি থাকা রোগীর স্বজন আবুল কালাম বলেন, ‘মানুষকে কষ্ট দিয়ে এসব প্রচারণার কোনো মানে হয় না।’ একই এলাকার দোকানি ওবায়দুল্লাহ মিয়া বলেন, ‘মাইকের আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা তাহজীব হাসান বলেন, মাঠপর্যায় থেকে অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে শব্দদূষণ পর্যবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেই বলেও জানান তিনি।
সিএ/এমই


