ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ঘটনায় সারা দেশে মোট ৬৬৩টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৩টি হত্যা মামলা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক প্রতিবেদনের অনুষ্ঠানে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্র ও জনতার হত্যাকারী, হত্যার নির্দেশদাতা ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৬৩টিতে শেখ হাসিনার নাম আসামি হিসেবে রয়েছে। মোট ৮৩৭টি হত্যা মামলার মধ্যে ৪৫৩টিতে হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে।
জুলাইয়ের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শেখ হাসিনাকে ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভারতে পালিয়ে যাওয়া তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।
টিআইবি জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১০৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে, যার মধ্যে ৩১টি হত্যা মামলা। এসব মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ ১২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, অভিযোগপত্রের তুলনায় মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় তদন্ত কার্যক্রমের ধীরগতি স্পষ্ট।
প্রতিবেদনে পুলিশবিরোধী মামলার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ৭৬১টি মামলা হয়েছে, যেখানে ১ হাজার ১৬৮ জন পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে, তবে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ৬১ জন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৪৫০টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে মামলা হয়েছে ৪৫টি। এসব মামলায় শেখ হাসিনাসহ ২০৯ জনকে আসামি করা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮৪ জন। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে ১২টি মামলা বিচারাধীন, যেখানে আসামির সংখ্যা ১০৫ জন।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক আসামিই গোপনে দেশত্যাগ করেছেন। তাঁদের দেশে পালানোর ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণ–অভ্যুত্থানের পরে নির্বিচার মামলা দায়ের ও ঢালাওভাবে আসামি করা নিয়ে টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এসব মামলায় সারা দেশে প্রায় দেড় লাখ মানুষকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে ২১ হাজার ৮৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজার ১৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৮১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে, যেখানে ৭৫ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তবে ৫৫ শতাংশ জামিনে মুক্ত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে মামলা ও গ্রেপ্তার–বাণিজ্য, প্রতিশোধমূলক মামলা, রাজনৈতিক হয়রানি, এবং মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চাপের মুখে তদন্ত ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলা গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক ও কৌঁসুলিদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকেও টিআইবি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া এবং কিছু অগ্রগতি স্বীকার করলেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে মামলার ভিত্তি দুর্বল, প্রতিবেদন তৈরিতে পদ্ধতিগত জটিলতা এবং ঘটনার পরিষ্কার চিত্র না থাকায় বিচার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। রায় সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হলেও ন্যায্য ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না হলে সমালোচনার সম্ভাবনা রয়েছে এবং প্রকৃত অপরাধীরাও দায় এড়িয়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পুলিশ সদস্যদের কর্মকাণ্ডের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থার বাইরে কার্যকর জবাবদিহি নেই। সরকারের সদিচ্ছা ও সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। অযৌক্তিক মামলা দায়ের, বিনা বিচারের আটক, দীর্ঘদিন আটকে রাখা, সরকারি প্রভাব প্রয়োগ এবং সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের হত্যার মতো মামলা দায়েরের বিষয় এখনো বিদ্যমান।
অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম, মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ ফেলো ফারহানা রহমান, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মোস্তফা কামাল, মোহাইমেনুল ইসলাম প্রমুখ।
সিএ/এমই


