বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর নতুন জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ জাতীয় সংসদকে কোটিপতি, দুর্বৃত্ত ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ক্লাব নয়, বরং গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। যুক্তফ্রন্ট অঙ্গীকার করেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাদের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ৯০ ও ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন এবং সমতার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করবে।
আজ শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত ইশতেহার পাঠ করেন যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবার কবীর জাহিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, জাতীয় গণফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা আমিরুন নুজহাত মনীষা, সোনার বাংলা পার্টির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হারুন অর রশীদ প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যেভাবে জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছে এবং গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কারগুলোকে চারটি প্রশ্নের একটি প্যাকেজে ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের মাধ্যমে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক। এই গণভোটে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়নি, ফলে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটবে না।
বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলে জুলাই সনদের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করলেও ভিন্নমতের বিষয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ করবে। জুলাই সনদে ৮ মাসের আলোচনা ও নোট অব ডিসেন্টের মর্মবস্তু প্রতিফলিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসও সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। রাষ্ট্রের চার মূলনীতি বহাল রাখার প্রস্তাব মানা হয়নি। জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার এবং এ নিয়ে আদালতে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।”
তিনি আরও বলেন, “আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন জনগণের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত হলেও, বিগত তিনটি নির্বাচনে কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ ছিল না। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের শাসন নিশ্চিত করাই এই জোটের মূল লক্ষ্য।”
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকার এখনো সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগ করছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিভিন্ন বড় দলের প্রার্থীরা প্রকাশ্যে আচরণবিধি লংঘন করছে। স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক দল নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ধর্মের ব্যবহার করে ‘বেহেস্তের টিকিট’ বিক্রি করছে, যা আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “প্রধান উপদেষ্টা যখন বলেন ‘একটি দলের কয়েকজন পাস করবে এবং তাদের দুই-একজন মন্ত্রীও হবেন’ এবং তার প্রেস সচিব যখন বলেন, ‘এবার ভোট গণনায় সময় বেশি লাগবে’, তখন সুষ্ঠু ভোট নিয়ে জনমনে সন্দেহ-অবিশ্বাস জন্ম নিতে বাধ্য। অভ্যুত্থানের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরমভাবে অবনতি হয়েছে। মাজার, খানকাহ, আখড়া-মন্দিরে ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও নারীদের ওপর হামলা এবং সাইবার বুলিং প্রমাণ করছে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান হয়নি।”
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮টি বিষয়ে অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমন, স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার ও প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস, শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন, জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবার গণমুখী সংস্কার, খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি সংস্কার, শ্রমিক অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়ন স্বাধীনতা, নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতা, যুবশক্তির বিকাশ, পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো, পরিবেশ, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও গবেষণার গণমুখী সংস্কার, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চেতনা, এবং পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সংহতি।
সিএ/এএ


