দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় জাল সনদের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) পরিচালিত সাম্প্রতিক যাচাই অভিযানে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ধরা পড়েছে। সেখানে কর্মরত ৬৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫৭ জনের সনদ প্রাথমিকভাবে জাল বলে শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে প্রশাসনিক তদন্তাধীন থাকায় প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
ডিআইএ সূত্র জানায়, সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে—সরাসরি তথ্য যাচাই এবং কিউআর কোড স্ক্যানিং। সন্দেহজনক সনদ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা সনদপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হয়। লিখিতভাবে জাল প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বেতন বন্ধ, অবৈধভাবে উত্তোলিত সরকারি অর্থ ফেরত আনা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক জাল সনদে নিয়োগ পেয়েছেন। শুধু সনদ জালিয়াতিই নয়, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ, অনুমোদনহীন বিষয়ে নিয়োগ এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে একই ব্যক্তিকে একাধিক পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে।
ডিআইএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১৮ মাসে ডিজিটাল ও সরাসরি যাচাই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রায় ৫০০ নতুন জাল সনদ শনাক্ত হয়েছে। প্রথম ধাপে ১ হাজার ৭৭২ জন জাল সনদধারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত এক বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে ৩৩০ জন এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় ১৩৬ জনসহ মোট ৪৬৬ জনের জাল সনদ নতুন করে চিহ্নিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শনাক্তের পর বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয় এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সেখান থেকেই আসে। ফলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সময় লাগছে। জনবল সংকট, ফাইলজট এবং একাধিক সংস্থার যাচাই প্রক্রিয়া বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিআইএ’র এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে অনেক কিছু শনাক্ত করেছি, কিন্তু সব তথ্য যাচাই করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বোর্ড ও অন্যান্য সংস্থার তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কিছু ক্ষেত্রে শুধু জাল সনদ নয়, অবৈধ নিয়োগ, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ এবং অনুমোদনহীন বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের ঘটনাও রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে একই ব্যক্তিকে একাধিক পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ডিআইএ’র পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জাল সনদ শনাক্তে আমরা নিয়মিতভাবে কাজ করছি এবং সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অনিয়ম আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে সামনে আসছে। আমাদের কাছে যেসব সনদ সন্দেহজনক মনে হয়, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সনদপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। লিখিতভাবে জাল প্রমাণিত হলেই আমরা তা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরবর্তী ধাপে পাঠাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত তা প্রকাশ করা যায় না। কারণ, একটি সনদ বা নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একাধিক সংস্থার যাচাই প্রয়োজন হয়। এছাড়া কিছু ঘটনায় শুধু জাল সনদ নয়, অবৈধ নিয়োগ, ভুয়া অভিজ্ঞতা এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে পদ সৃষ্টির মতো বিষয়ও পাওয়া যাচ্ছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।’
তিনি বলেন, আমরা চাই প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার একটি কার্যকর প্রক্রিয়া চালু হোক। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রস্তাব আকারে তুলে ধরা হয়েছে। নতুন করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে শিক্ষা খাতে এই অনিয়ম অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিএ/এএ


