প্রায় দেড় যুগ অর্থাৎ ১৭ বছর পর উৎসবমুখর পরিবেশে সারাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটারদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে দেশের অধিকাংশ সংসদীয় আসনের নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রগুলোতে। জুলাই সনদের বৈধতার প্রশ্নে গণভোটও আয়োজিত হয় একইসঙ্গে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ১৮ মাসের মাথায় এই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপলক্ষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝেই বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। বিগত সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত হওয়া তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গোটা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারানো ভোটাররা স্বপ্রণোদিত হয়ে স্ব স্ব কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন এবার। সঙ্গে জুলাই সনদের আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রশ্নেও নিজেদের মতামত জানাচ্ছেন ভোটাররা।
বিশেষ করে ‘জেন জি’ তথা তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের মাঝে ভোট নিয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বাস নজরে এসেছে। ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি ভোটারেরই বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এদের অনেকেই এবার প্রথম ভোট দিচ্ছেন। অনলাইন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে এই প্রজন্মের কিছু মানুষ ভোট দেওয়ার পর নিজেদের অনুভূতি নিয়ে কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে এবার স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছেন মোজাম্মেল হক হৃদয়। কুড়িগ্রাম-০৪ আসনের আওতায় চর রাজিবপুরের কোদালকাটি এলাকার নাজিমুদ্দৌলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দেন তিনি।
মোজাম্মেল ভোট দেওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, বুঝতে শেখার পর থেকে কয়েকবার জাতীয় নির্বাচন দেখেছি। বারবার আল্লাহর কাছে চেয়েছি যেন “সুষ্ঠুভাবে সঠিক পন্থায়” ভোটের পরিবেশ তৈরি হয় এবং বর্তমানে সেটি দেখার তৌফিক হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের মাঝে যে উদ্দীপনা তা দেখেই ভালো লাগছে। তাঁর মতে, “সবকিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশ।” ক্ষমতায় যেই আসুক শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ দেশ বিনির্মাণে শতভাগ ভূমিকা রেখে নির্বাচিত ও অনির্বাচিত সকলেই বাংলাদেশমুখী এবং সততায় বলিয়ান হয়ে উঠবেন–এটাই প্রত্যাশা মোজাম্মেল হকের।
নোয়াখালীর হাতিয়া এলাকার বাসিন্দা রাকিবুল হাসান মুন্না। ১২ তারিখ ভোট দিয়েছেন নোয়াখালী-০৬ আসনের আওতাধীন জাহাজমারা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। ২১ বছর বয়সী এই তরুণ ভোট দেওয়ার পর জানান, দীর্ঘ দেড় যুগ পর আয়োজিত উৎসবমুখর নির্বাচনে অংশ নিতে পেরে একজন জেন-জি ভোটার হিসেবে আমি গর্বিত। ন্যায় ও ইনসাফের আদর্শে প্রথম ভোট শহীদ ওসমান হাদির স্মরণে দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিগত শাসনামলে “ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ মেলেনি” জানিয়ে রাকিবুল বলেন, আগের সরকারের সময় আমি ভোটার তালিকাভুক্ত হলেও ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাইনি। ফলে এবারের নির্বাচনে স্বাধীন ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারা ছিল এক বিশেষ ও আবেগঘন মুহূর্ত। এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে আরও শক্তিশালী করার সঙ্গে সঙ্গে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও সুন্দর নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ সুগম করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক শিক্ষার্থী তামান্না শিরিন। ভোট দিয়েছেন খুলনা-০৫ সংসদীয় আসনের আওতাধীন ফুলতলা উপজেলার ৩ নং ওয়ার্ডের আলকা পল্লী মঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে।
ভোট দেওয়ার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রায় দেড় যুগ পর উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে ভোট দিয়ে একজন জেন-জি ভোটার হিসেবে আমি ভীষণ আশাবাদী। তাঁর মতো সকলের এই “প্রথম ভোটের” মধ্য দিয়ে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, উন্নয়নমুখী এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের সূচনা হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী খোঃ রিয়াসাত ইসলাম অমিয় ঢাকা-০৭ সংসদীয় আসনের আওতাধীন রাজধানীর বকশীবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দেন।
রিয়াসাত বলেন, আজ ভোট দিতে গিয়ে মনে হয়েছে নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্বটা সত্যিই পালন করলাম। তরুণ প্রজন্ম সচেতনভাবে ভোটপ্রদান কার্যক্রমে অংশ নিলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, আগামীর বাংলাদেশ হোক ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিতামূলক ও সবার জন্য সমান সুযোগের।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী এবং শাখা ইনকিলাব মঞ্চের প্রচার ও গণমাধ্যম বিষয়ক সম্পাদক মো. নিয়াজ মাখদুম।
পটুয়াখালী-০৩ আসনের আওতাধীন পাড় ডাকুয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট প্রদান শেষে নিয়াজ বলেন, দেড় যুগ পর উৎসবমুখর নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দিতে পেরে আমি গভীর গর্ব ও দায়িত্ববোধ অনুভব করেছি। মনে হয়েছে, আমার একটি ভোটই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথে ছোট, কিন্তু অর্থবহ পদক্ষেপ।
তাঁর প্রত্যাশা, আগামীর বাংলাদেশ হবে সত্যিকারের জবাবদিহিতামূলক, যেখানে নির্বাচিত এমপি ও সরকারি কর্মকর্তারা হবেন দুর্নীতিমুক্ত, প্রশাসন হবে স্বচ্ছ ও জনবান্ধব। তিনি এমন এক রাষ্ট্র চান, যেখানে নাগরিকেরা দল-মত, গোষ্ঠী বা বর্ণের ভেদাভেদ ছাড়াই সমান অধিকার ভোগ করবে এবং কারও ওপর কোনো প্রকার জুলুম-নিপীড়ন থাকবে না। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের প্রতিটি স্তরের নাগরিকদের জন্য ইনসাফ নিশ্চিত করাই সকলের একমাত্র প্রত্যাশা হওয়া উচিত।
গাইবান্ধার সন্তান শুভ কর্মকারও নলডাঙ্গা উমেশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন ১২ তারিখ দুপুরে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী বলেন, আমি ভোট আগেও দিয়েছি। তাই ভোট নিয়ে তেমন কোনো অন্যরকম অনুভুতি নাই।
কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে অনেক প্রত্যাশা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো প্রকার বৈষম্য, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না–এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখি আমি। সরকার ভাববে সকলকে নিয়ে। তরুণ, নারী সকলের জন্য তৈরি করবে কর্মসংস্থান, মানুষ বাঁচবে নিশ্চয়তায় এবং নিরাপদে–এটাই প্রত্যাশা।
পঞ্চগড় -১ সংসদীয় আসনের আওতাধীন পঞ্চগড় সদরের একটি প্রাথমিক স্কুলে ভোট দেওয়া হালিমা বর্ণি ভোট দেওয়ার অনুভূতি নিয়ে বলেন, আমি অনেক খুশি কারণ এটাই আমার “জীবন ও যৌবনের” প্রথম ভোট। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে সুষ্ঠুভাবেই নির্বাচন হচ্ছে, এটা ভেবে আরও ভালো লাগছে।
আগামীর বাংলাদেশ কেমন দেখতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে বর্ণি বলেন, আগামীর বাংলাদেশকে দেখতে চাই ন্যায় ও “ইনসাফের বাংলাদেশ” হিসেবে। যেই বাংলাদেশে দুর্নীতি, চাঁদাবাজ, সুদ-ঘুষ,গুম-খুন, ধর্ষণ থাকবে না; যেখানে সবার স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ থাকবে। প্রতিহিংসামূলক অসুস্থ রাজনীতিমুক্ত একটি পরিবেশ সর্বত্র দেখার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
ঢাকা-১১ সংসদীয় আসনের আওতাধীন বাড্ডা আলাতুন্নেছা হাই স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিয়ে এসে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাজমুস সাঈদ উচ্ছ্বসিত অবস্থায় বলেন, এ রকম উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার দৃশ্য আমার মনে হয় না আর কখনো দেখা গেছে। যে যাকে খুশি ভোট দিচ্ছে নির্বিঘ্নে। সকল কেন্দ্রের পরিবেশই সুষ্ঠু ছিল এমন আমার ধারণা। এর মাধ্যমে সকলের “বহুলাকাঙ্ক্ষিত একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে বলে মনে করেন তিনি।
রুশাইদ আহমেদ, প্রতিনিধি
সিএ/জেএইচ


