লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকায় মারা যাওয়া সুনামগঞ্জের তরুণ মহিবুর রহমানের (২০) মৃত্যুর খবর পরিবার থেকে দুই দিন গোপন রাখেন দালাল। যখন তাঁর লাশ সাগরে ভাসছিল, তখনও দালাল নবী হোসেন দেশে পরিবারের সদস্যদের জানান, মহিবুর গ্রিসে পৌঁছে ক্যাম্পে অবস্থান করছেন। এতে পরিবার প্রথমে নিশ্চিত হতে না পেরে নানা দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটায়।
রাবারের বোটে করে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর খবর দেশে তাঁদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে যায় গত শনিবার ( ২৮ মার্চ) বিকেলে। তবে মহিবুর রহমানের পরিবার তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারে দুই দিন পর সোমবার। এর আগে পরিবারের সদস্যরা দালাল নবী হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি।
মহিবুর রহমান সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের গাগলাজুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা মো. নুরুল আমিন এবং মা মহিমা বেগম। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। দেশে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং তাঁর উপার্জনের ওপরই নির্ভর করত পুরো পরিবার।
মহিবুরের চাচাতো ভাই এবং ভাতগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ সুনু মিয়া জানান, প্রায় চার মাস আগে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন মহিবুর। প্রথমে সৌদি আরব হয়ে পরে লিবিয়ায় যান তিনি। সেখানে অবস্থানকালে পরিবারকে একাধিকবার জানান যে তিনি খুব কষ্টে আছেন এবং দেশে ফিরে আসতে চান। তবু দালাল নবী হোসেনের মাধ্যমে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান। নবী হোসেনের বাড়ি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা এলাকায় হলেও তিনি বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে দরিদ্র নুরুল আমিন জমি বিক্রি করেন এবং মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা এনে মোট ১৩ লাখ টাকা দেন।
স্বজনদের ভাষ্য, গত শনিবার ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর খবর দেশে আসার পর থেকেই মহিবুরের পরিবার দালাল নবী হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। প্রথমে তিনি জানান পরে জানাবেন। পরে আবার দাবি করেন, মহিবুর গ্রিসে পৌঁছেছেন। এতে সন্দেহ হলে পরিবারের সদস্যরা পাগলা এলাকায় নবী হোসেনের বাড়িতে যান। সেখান থেকে সুনু মিয়া নিজে মুঠোফোনে কথা বলেন নবী হোসেনের সঙ্গে। তখন নবী হোসেন নিশ্চিত করেন যে মহিবুরকে ওই নৌকায় তুলে দেওয়া হয়েছিল, তবে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি তখনও গোপন রাখা হয়।
পরে ওই নৌকা থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের তরুণ মারুফ আহমদ দেশে ফোন করে জানান, নৌকায় সবার আগে মৃত্যু হয় মহিবুর রহমানের। পরে অন্যদের সঙ্গে তাঁর লাশও সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। মহিবুর ও মারুফ একসঙ্গেই দেশ ছাড়েন এবং সৌদি আরব ও লিবিয়ায়ও একসঙ্গে ছিলেন।
মহিবুরের মামাতো ভাই একই গ্রামের বাসিন্দা সিব্বির আহমদ বলেন, ‘আমরা বারবার যোগাযোগ করার পরও দালাল নবী হোসেন বলে, মহিবুর নাকি গ্রিসে পৌঁছে গেছে। ক্যাম্পে আছে, এখন কথা বলা যাবে না। এভাবে টালবাহানা করে দুই দিন পার করা হয়। আমরা তো অস্থির। দুই দিন পর জানতে পারি, আমার ভাই আর নাই।’
জানা গেছে, লিবিয়া থেকে রাবারের বোটটি গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে শুক্রবার ( ২১ মার্চ)। পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাটি দিক হারিয়ে ফেলে এবং টানা ছয় দিন সাগরে ভেসে থাকে। এ সময় নৌকার জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে অনাহারে একে একে মারা যান ২২ জন যাত্রী, যাঁদের অধিকাংশই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। দুই দিন ধরে লাশগুলো নৌকায় পড়ে ছিল। পরে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে দালালের নির্দেশে সেগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। শুক্রবার ( ২৭ মার্চ) গ্রিসের উপকূলে পৌঁছানোর পর জীবিতদের উদ্ধার করা হলে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে।
সিএ/এমই


