রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যায় দুই বছর চার মাস বয়সী শিশু সাবিহা। তবে সেই দুর্ঘটনায় তার বড় ভাই সাবিত ইসলাম (৭) ও ফুফাতো বোন সোয়ানা আক্তার (১১) মারা যায়। ঘটনার পর থেকে ছোট্ট সাবিহা প্রায়ই ভাই ও ফুফাতো বোনকে খুঁজে বেড়ায় বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
সাবিহা রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশী ইউনিয়নের আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলাম ও শাকিলা সুলতানার মেয়ে। দুর্ঘটনায় শরিফুল ইসলাম তাঁর একমাত্র ছেলে সাবিত ইসলামকে হারিয়েছেন। একই ঘটনায় মারা যায় তাঁর ভাগনি সোয়ানা আক্তার। শরিফুল ইসলাম স্থানীয় দাদশী বাজারের সাবিত মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঈদের তিন দিন আগে শরিফুল ইসলামের বোন নাসরীন সুলতানা তাঁর একমাত্র মেয়ে সোয়ানাকে নিয়ে বাবার বাড়ি আগমারাই গ্রামে আসেন। ঈদের ছুটি শেষে গত ২৫ মার্চ বিকেলে রাজবাড়ী শহরের বড়পুল এলাকা থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাসে সাভারের নবীনগরের উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। বাসে ছিলেন নাসরীন সুলতানা, তাঁর মেয়ে সোয়ানা, শরিফুল ইসলামের স্ত্রী শাকিলা সুলতানা এবং তাঁদের সন্তান সাবিত ও সাবিহা।
সাবিহার নানা নবিজদ্দিন মল্লিক জানান, তিনি নিজে পরিবারের সদস্যদের বাসে তুলে দিয়ে বাড়িতে ফিরে যান। কিছু সময় পর খবর পান, দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে গেছে। দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি শাকিলা, নাসরীন ও সাবিহাকে জীবিত অবস্থায় পান। তবে তখন সাবিত ও সোয়ানাকে পাওয়া যায়নি। পরে ডুবুরি দল বাসটি উদ্ধার করলে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া শাকিলা সুলতানা এখনও সেই ভয়াবহ মুহূর্ত ভুলতে পারছেন না। বর্তমানে অসুস্থ হয়ে তিনি বাড়িতে শয্যাশায়ী। ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বাসের পেছনের দিকে দ্বিতীয় সারিতে ছিল আমার সিট। কোলেই ঘুমিয়ে ছিল সাবিহা। পেছনের সিটে বসে ছিলেন ননদ নাসরীন, তাঁর মেয়ে সোয়ানা ও আমার ছেলে সাবিত। ঘাটে ফেরির জন্য ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষা করছিল। গরমে সাবিত বলছিল, “আম্মু, অনেক গরম লাগছে, চলো বাস থেকে নামি।” এ–ই ছিল সাবিতের সঙ্গে আমার শেষ কথা। আমি সাবিতের কথায় নামিনি, নামলে ছেলে আমার বেঁচে যেত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাবিহা সারা দিন সাবিতের কোলেই থাকত, ঘুরে বেড়াত। তাই বড় ভাইকে না পেয়ে ভাই, ভাই বলে খুঁজতে থাকে সাবিহা। মাঝেমধ্যে সোয়ানাকেও খোঁজে। আমি ওদের কোত্থেকে এনে দেব।’
শাকিলা সুলতানা বলেন, ‘বাসটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর কিসের সঙ্গে যেন আমার পায়ের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। ঠিক তখনই পানির ওপর ভেসে ওঠে আমার সাবিহা। আমি লোকজনকে সাবিহাকে নিতে বলি আর সাবিতের খোঁজ করতে থাকি। লোকজন জানায়, একটি ছেলেকে পন্টুনে তোলা হয়েছে। পন্টুনে এসে দেখি, আমার সাবিত নাই। পরে লোকজন আমার ননদ নাসরীনকে টেনে তোলে। তাঁর মেয়েকেও তখন খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
শাকিলার স্বামী শরিফুল ইসলাম জানান, তাঁর ছেলে সাবিতের পেটে চর্মরোগ দেখা দেওয়ায় ছোট বোন নাসরীনের সঙ্গে তাঁদের সাভারে চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর বাবা রাজবাড়ী বড়পুল এলাকা থেকে তাঁদের বাসে তুলে দেন। কিছু সময় পরই খবর আসে, সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নদীতে পড়ে গেছে। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি স্ত্রী শাকিলা, মেয়ে সাবিহা ও বোন নাসরীনকে জীবিত পান, কিন্তু ছেলে সাবিত ও ভাগনি সোয়ানাকে আর জীবিত পাওয়া যায়নি।
সিএ/এমই


