জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে মাদারীপুরে ফিলিং স্টেশনগুলোতে মোটরসাইকেলচালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তেল পাওয়ার আশায় অনেকেই ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও সীমিত সরবরাহের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর অল্প পরিমাণ তেল নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। এতে কর্মজীবী মানুষদের কাজেও বিঘ্ন ঘটছে।
মাদারীপুর শহরের পাকদি এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (৪০) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে কাজ করেন। সোমবার (৩০ মার্চ) ভোর থেকে শহরের তিনটি পেট্রলপাম্পে ঘুরেও তেল পাননি তিনি। পরে শহরের ইউসূফ ফিলিং স্টেশনে গিয়ে লাইনে দাঁড়ান। দুপুর ১২টার দিকে সেখানে তেলের ট্রাক পৌঁছালে দুই শতাধিক মোটরসাইকেলচালক একসঙ্গে তেল নেওয়ার জন্য ভিড় করেন। এতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বেলা দুইটার দিকে তিনি ৩০০ টাকার পেট্রল পান।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে তেল পেলাম। সকাল ৯টা থেকে এই পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে এক বেলা শেষ। অন্য বেলায় কাজ করব কখন? ৩০০ টাকার তেল দিয়ে তো আর দুই দিনও চলবে না। তারপর তেল ছাড়া চলব কীভাবে, সেটাই ভাবছি। এমন চলতে থাকলে মার্কেটিংয়ের যে চাকরিটা করি, সেটাও চলে যাবে।’
সোমবার সরেজমিনে ইউসূফ ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, শত শত মোটরসাইকেলচালক পেট্রল কিনতে ভিড় করেছেন। তেল সরবরাহ করতে গিয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও পাম্পের কর্মীরা হ্যান্ডমাইকের মাধ্যমে ক্রেতাদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অন্তত ২৫০ জন মোটরসাইকেলচালককে সেখানে তেলের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারির কারণে ফিলিং স্টেশনের ভেতরে অন্য কোনো গাড়ি ঢোকার সুযোগ ছিল না। বেলা একটার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্স পাম্পে ঢোকার চেষ্টা করলেও মোটরসাইকেলের ভিড়ের কারণে সেটি ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
ক্রেতাদের অভিযোগ, জেলার অনেক ফিলিং স্টেশনে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেলের জোগান থাকলেও সেগুলো সার্বক্ষণিক বিক্রি করা হয় না। নির্দিষ্ট সময় তেল বিক্রি করে পরে পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পাম্প দীর্ঘ সময় তেল বিক্রি বন্ধ রাখে। এতে ক্রেতাদের ভোগান্তি বাড়ছে।
ফিলিং স্টেশনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, জ্বালানি তেল সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুযায়ী পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ করছে না। সার্বক্ষণিক সরবরাহ চালু করা হলে ভিড় কমতে পারে, অন্যথায় সংকট আরও বাড়বে।
ইউসূফ ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসূফ হাওলাদার বলেন, আগের তুলনায় সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও ক্রেতার চাপ অনেক বেশি। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ৩০ হাজার লিটার পেট্রল বিক্রি হলেও মার্চে তা বেড়ে প্রায় ৪০ হাজার লিটারে পৌঁছেছে। তবে নির্ধারিত সময় ছাড়া ২৪ ঘণ্টা তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজৈর উপজেলা থেকে আসা সুমন বিশ্বাস জানান, নিজের এলাকায় তেল না পেয়ে তিনি মাদারীপুর শহরে এসেছেন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি মাত্র ৩০০ টাকার পেট্রল পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে মোটরসাইকেল ব্যবহার করি। সেটি চালানো এখন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তেল কিনতে এমন দুর্ভোগ সহ্য করা যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের জন্য সময় অপচয় করা থেকে আমরা মুক্তি চাই।’
আরেক ক্রেতা মোহাম্মদ হাসিবুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, জেলার অনেক পাম্পে দিনের বেশির ভাগ সময় পেট্রল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ থাকে। শুধু এই পাম্পে দিনে একবার তেল পাওয়া যায়, তাই এখানে ভিড় বেশি।
মাদারীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান খান ও তাঁর পরিবারের মালিকানাধীন সার্বিক ফিলিং স্টেশনে দিনের বেশির ভাগ সময় পেট্রল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ থাকে বলে স্থানীয়রা জানান। সেখানে মূলত তাঁদের নিজস্ব ‘সার্বিক পরিবহন’ চালু রাখতে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। পাম্পে ডিজেল থাকলেও অন্য কোনো যানবাহনে তা বিক্রি করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মাদারীপুর সদরের মস্তফাপুর এলাকার মাদারীপুর ফিলিং স্টেশন, পখিরা এলাকার আড়িয়াল খাঁ ফিলিং স্টেশন, ঘটকচর এলাকার মোল্লা ফিলিং স্টেশন এবং খোয়াজপুর এলাকার খান ফিলিং স্টেশনেও জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে দিনের বেশির ভাগ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকে। মাঝে মাঝে সীমিত সময়ের জন্য তেল বিক্রি করা হলেও দ্রুত তা শেষ হয়ে যায়।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সারা দেশেই জ্বালানি তেলের সংকট থাকায় মাদারীপুরের তেলপাম্পগুলোয় তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। তবে তেল মজুত রাখার কোনো সুযোগ নেই। যদি কোনো ফিলিং স্টেশন তেল মজুত রাখে, তাহলে সেই স্টেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমরা নিয়মিত তদারকি ও অভিযান অব্যাহত রেখেছি।’
সিএ/এমই


