সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে অনেক পরিবার সন্তানদের অবৈধ পথে ইউরোপে পাঠাচ্ছে। কেউ উন্নত জীবনের আশায় স্বেচ্ছায় আবার কেউ সামাজিক ও পারিবারিক চাপে বাধ্য হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এতে অনেক পরিবার জমিজমা বিক্রি কিংবা ধারদেনা করে বিপুল অর্থ জোগাড় করছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া তরুণ শায়েক আহমদের ঘটনা সেই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। ২৩ বছর বয়সী শায়েকের পরিবার তাঁকে বিদেশে পাঠাতে দুই দফায় দালালদের ১২ লাখ টাকা দেয়। এই অর্থ জোগাড় করতে তাঁর বাবা আখলুছ মিয়াকে গোয়ালের গরু ও হাওরের জমি বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্রিসে পৌঁছানোর আগেই ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু হয় শায়েকের।
শায়েকের স্বজনেরা জানান, তাঁকে গ্রিসে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন একই উপজেলার বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম। একইভাবে জগন্নাথপুর উপজেলার আরও কয়েকজন তরুণকেও তিনি লিবিয়ায় নিয়ে যান। যাঁদের মধ্যে কয়েকজনও একই ঘটনায় মারা গেছেন। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দালালদের বিচার দাবি করছে।
গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে ৩৮ জনকে নিয়ে একটি রাবারের বোট গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু মাঝপথে ভূমধ্যসাগরে বোটটি পথ হারিয়ে ফেলে এবং ছয় দিন ধরে সাগরে ভেসে থাকে। দীর্ঘ সময় খাবার ও পানির অভাবে বোটে থাকা অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ১৮ জন মারা যান। দুই দিন লাশগুলো বোটে রাখার পর দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে সেগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে ২৭ মার্চ শুক্রবার গ্রিস উপকূলে পৌঁছানোর পর বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত জানা যায়।
মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন রয়েছেন। জীবিত ফিরে আসা এক যুবক জানিয়েছেন, ওই বোটে দালাল আজিজুল ইসলামের আটজন লোক ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে পাঁচজনই মারা গেছেন।
রোববার দুপুরে জগন্নাথপুর উপজেলার টিয়ারগাঁও গ্রামে শায়েকের বাড়িতে গিয়ে স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও কয়েকজন দালালের নাম জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে পারাগাঁও গ্রামের শাহিন মিয়া, বালিকান্দির এনাম আহমদ এবং ছিলাউরা গ্রামের করিম মিয়ার নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, এলাকায় একটি সংগঠিত চক্র গড়ে উঠেছে, যারা বিভিন্নভাবে তরুণদের ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দালালদের প্রলোভনে পড়ে তরুণরা পরিবারকে বিদেশে পাঠানোর জন্য চাপ দেয়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে জমিজমা বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে বিপুল অর্থ জোগাড় করে। একজনকে ইউরোপে পাঠাতে সাধারণত ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের তিনজনও একই ঘটনায় মারা গেছেন। স্থানীয়দের মতে, তাঁদের লিবিয়ায় পাঠিয়েছিলেন দোয়ারাবাজার উপজেলার জসিম উদ্দিন নামের এক দালাল। তাঁর স্থানীয় প্রতিনিধি থাকলেও তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করতে অনেকে অনীহা প্রকাশ করেছেন।
তারাপাশা গ্রামের বাসিন্দা ও কুলঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য এওর মিয়া বলেন, ‘গ্রামের মারা যাওয়া তিনজনই আমার আত্মীয়। এখন টাকাও গেল, মানুষও গেল। আমি অন্যরে দোষ দিই না। আমরাই তো দালালদের কাছে যাই।’
দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের তরুণ ফাহিম আহমদও একই বোটে মারা যান। তাঁর পরিবার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তাঁকে গ্রিসে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, ফাহিমকে বিদেশে পাঠানোর সঙ্গে তাঁর আপন মামা জামাল উদ্দিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। জামাল উদ্দিন ও তাঁর ভাই আবদুর রহিম ওরফে জসিম উদ্দিন লিবিয়ায় অবস্থান করছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মানব পাচার সংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য জামাল উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফাহিমের চাচা তাইজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আসলে এভাবে অবৈধভাবে ফাহিমকে বিদেশে পাঠানোর পক্ষে ছিলাম না।’
বোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিলন খান বলেন, উন্নত জীবনের আশায় মানব পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে অনেকেই অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলার দালালদের তালিকা করে পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। সব উপজেলায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে প্রশাসন রয়েছে এবং যাঁদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ, তাঁদের সহযোগিতার বিষয়েও ভাবা হচ্ছে।
এদিকে সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে এবং নিয়মিতভাবেই অবৈধ পথে বিদেশে লোক পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ঘটনা ঘটলেই কথা বলি। কিছুদিন গেলে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। এর মধ্যে জগন্নাথপুর, ছাতক, শান্তিগঞ্জ, দিরাই, দোয়ারাবাজার উপজেলায় বেশি। দালাল চক্র জেলাজুড়েই সক্রিয়। এদের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে দালালদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। কোনো পরিবার মামলা না করলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে।
সিএ/এমই


