বাংলাদেশের নদ-নদীতে গাঙ্গেয় শুশুক বা ডলফিনের উপস্থিতি ও আচরণ নিয়ে নতুন গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এ গবেষণায় প্রথমবারের মতো শব্দতরঙ্গভিত্তিক রিয়েল-টাইম অ্যাকুস্টিক মনিটরিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর নিম্নপ্রবাহের বালুচরের আশপাশে ডলফিনের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি।
তিন বছর মেয়াদি এই গবেষণা প্রকল্প চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সন্দ্বীপ ও বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীতে গবেষকেরা প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে ১৪৬টি গাঙ্গেয় ডলফিন শনাক্ত করেছেন। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডলফিনের আবাসস্থল, আচরণ ও পরিবেশগত অবস্থা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
গাঙ্গেয় শুশুক বাংলাদেশের জাতীয় জলজ প্রাণী। ঘোলা পানির নদীতে বসবাসকারী এই প্রাণীর চোখ থাকলেও কার্যত দৃষ্টিশক্তি নেই। তাই তারা উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ তরঙ্গ ছড়িয়ে তার প্রতিধ্বনি বিশ্লেষণ করে শিকার খুঁজে নেয় এবং চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। এই ইকোলোকেশন পদ্ধতির মাধ্যমে তারা নদীর গভীরতা ও আশপাশের অবস্থান নির্ধারণ করে চলাচল করে।
গবেষণা প্রকল্পটি চীন ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। এটি ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং ‘অ্যালায়েন্স অব ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স অর্গানাইজেশনস’-এর সহায়তা পাচ্ছে। গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ডলফিনের উপস্থিতি ও আচরণ সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে, যা ভবিষ্যতে সংরক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষণা প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, ‘ডলফিন খুব অল্প সময়ের জন্য পানির ওপর ভেসে ওঠে। তাই চোখে দেখে গণনা করা প্রায় অসম্ভব। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা তাদের সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারব।’
গবেষক দল সূত্রে জানা গেছে, রিয়েল-টাইম অ্যাকুস্টিক মনিটরিং প্রযুক্তিকে গবেষকেরা ‘টেক ইয়ারস’ নামে উল্লেখ করেন। পানির নিচে উৎপন্ন শব্দতরঙ্গ বিশ্লেষণ করে এই প্রযুক্তি ডলফিনের ইকোলোকেশন সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম। মনিটরিং যন্ত্র নদীর তলদেশে স্থাপন করে ডলফিনের সোনার সংকেত শনাক্ত করা হয়। এতে ২৬টি ভিন্ন প্যারামিটার ব্যবহার করে বিভিন্ন নদীর পরিবেশ অনুযায়ী প্রযুক্তিকে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ডলফিন সরাসরি চোখে দেখা গেছে, তাদের প্রায় সবকেই শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে শনাক্ত করা গেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে শব্দ সংকেত পাওয়া গেলেও দৃশ্যমানভাবে ডলফিন দেখা যায়নি। এতে প্রমাণিত হয়েছে, এই প্রজাতির ক্ষেত্রে শব্দভিত্তিক পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত কার্যকর।
গবেষকেরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশের নদীভিত্তিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চোখের আড়ালে থাকা এই প্রাণীকে শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে শনাক্ত করে তাদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া সহজ হবে।
ইকোফিশের সাবেক গবেষণা সহকারী এবং বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি বলেন, ‘ডলফিন নিয়ে দেশে প্রযুক্তিনির্ভর এ ধরনের গবেষণা এটাই প্রথম। এটি আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক।’ মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি নদীর মোহনায় এখনো ডলফিন দেখা যায়। কিন্তু জেলেদের অসচেতনতা ও কুসংস্কারের কারণে তাদের আবাসস্থল হুমকিতে। অনেক ক্ষেত্রে জালে আটকে পড়া ডলফিনকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার স্বাদু পানির এই ডলফিন নদীর বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একসময় দেশের অনেক নদীতেই শুশুক দেখা যেত। তবে গত কয়েক দশকে এদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং বর্তমানে প্রধানত সুন্দরবন ও আশপাশের নদীগুলোতেই এদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন গাঙ্গেয় ডলফিনকে বিপন্ন প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ২০২৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও বন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বর্তমানে দেশের মাত্র ১৪টি নদ-নদীতে এই ডলফিনের উপস্থিতি রয়েছে।
গবেষণায় আরও জানা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট বছরে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে অন্তত ১৩৫টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। তবে এসব মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে একটিরও ময়নাতদন্ত হয়নি।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাছ ধরার জালে আটকে পড়া, পানিদূষণ এবং নৌযান বা জাহাজের ধাক্কা ডলফিনের মৃত্যুর প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমুদ্র ও নদীর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় ডলফিনের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও মৎস্য গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র কতটা ভালো আছে, তা বোঝা যায় ডলফিন দেখে। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে এদের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। সুনীল অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে হলে ডলফিনের জন্য নিরাপদ অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে হবে।’
সিএ/এমই


