বাংলা লোকসংগীতের কিংবদন্তি বাউল শাহ আবদুল করিমের ১১০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সুনামগঞ্জে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী শাহ আবদুল করিম লোক উৎসব। মানুষের মুক্তি, সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা ছিল তাঁর দর্শন ও গানের মূল কথা—এ কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, জীবনভর তিনি মানুষের জয়গান গেয়েছেন এবং তাঁর গান আজও মানুষকে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে জাগ্রত করে।
শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) রাতে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে এ লোক উৎসবের উদ্বোধনী আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসন ও শাহ আবদুল করিম পরিষদের যৌথ উদ্যোগে তাঁর জন্মস্থানেই এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।
বসন্তের পড়ন্ত বিকেলে করিমের বাড়ি থেকে তাঁর বিখ্যাত গান ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মুরশিদী গাইতাম, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম…’ গেয়ে হেঁটে হেঁটে উৎসবস্থলে আসেন একদল বাউল। এ সময় উৎসবের মাঠজুড়ে ছিল হাজারো মানুষের উপস্থিতি। করিমের বাড়ির দক্ষিণ পাশে কালনী নদীর তীরে করচগাছের নিচে ছোট ছোট দলে বসে আগেই শুরু হয়েছিল গানের আসর। সেই সুর ছড়িয়ে পড়ে উজানধলের বাতাসে ও কালনী নদীর ঢেউয়ে। উৎসবকে ঘিরে করিমের বাড়ি ও নদীতীরে ভক্ত ও অনুরাগীদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয় পুরো এলাকা।
রাত আটটায় অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন, দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার এবং তাড়ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদ। স্বাগত বক্তব্য দেন শাহ আবদুল করিম পরিষদের সভাপতি ও তাঁর ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, শাহ আবদুল করিম ছিলেন এক ক্ষণজন্মা মানুষ। তাঁর জীবনঘনিষ্ঠ, আধ্যাত্মিক ও মর্মস্পর্শী গান মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সহজিয়া জীবনবোধ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ তাঁর গানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি যেমন মানুষকে ভালোবাসতেন, তেমনি মানুষও তাঁকে ভালোবাসত। সেই টানেই আজও মানুষ উজানধলে ছুটে আসে।
সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, শাহ আবদুল করিম উজানধলের বসন্তের বাতাসে এবং কালনী নদীর ঢেউয়ে মিশে আছেন। মানুষই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। এই লোক উৎসব সাম্য, সম্প্রীতি ও মৈত্রীর এক মিলনমেলা। তিনি বলেন, শুদ্ধ স্বর ও যথাযথ কথায় করিমের গান পরিবেশন করা প্রয়োজন—এটাই তিনি নিজেও চাইতেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, সুনামগঞ্জ বাউল, সাধক ও গুণীজনের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এই জেলায় শাহ আবদুল করিম সাধারণ ভাষায় অসাধারণ ভাব প্রকাশ করেছেন। তাঁর সৃষ্টি সংরক্ষণে জেলা প্রশাসন সব সময় পাশে থাকবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চে করিমের জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেন তাঁর শিষ্য ও অনুরাগীরা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা সেই গানে মুগ্ধ হয়ে অংশ নেন। ‘বসন্ত বাতাসে সই গো…’, ‘বন্ধুরে কই পাগো সখি গো…’, ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান…’, ‘আমি বাংলা মায়ের ছেলে…’, ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে…’, ‘গাড়ি চলে না রে…’, ‘তুমি আমার আমি তোমার…’, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু…’, ‘তুমি বিনে আকুল পরাণ…’, ‘তুমি মানুষ আমি মানুষ…’, ‘আসি বলে গেল বন্ধু আইল না…’সহ তাঁর জনপ্রিয় অনেক গান পরিবেশিত হয়।
আয়োজকেরা জানান, ২০০৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এই লোক উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত, সাধক ও সংগীতপ্রেমীরা এতে অংশ নিতে উজানধল গ্রামে আসেন। এখানেই ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন শাহ আবদুল করিম। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) এই উৎসবের সমাপ্তি হওয়ার কথা রয়েছে।
সিএ/এমই


