ঝিনাইদহে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে আহত হয়ে মারা যাওয়া কৃষক দল নেতা তরু মিয়ার মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঝিনাইদহ মর্গ থেকে মরদেহ নিয়ে শহরে এই বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। পরে শহর প্রদক্ষিণ শেষে মরদেহ দাফনের জন্য তাঁর গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়।
অন্যদিকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সংঘর্ষের সময় স্ট্রোক করেই তরু মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। তাদের দাবি, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
জানা গেছে, শুক্রবার ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে জামায়াতের নারী কর্মীদের একটি সভা আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত আটজন আহত হন। আহতদের ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে তরু মিয়ার শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকেরা তাঁকে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি মারা যান।
নিহত তরু মিয়া (৪৮) ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামের প্রয়াত মনছুর আলী মুন্সির ছেলে। তিনি গান্না ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন বলে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গান্না ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন বলেন, রাতে নিহতের মরদেহ ঢাকা থেকে ঝিনাইদহে আনা হয়। সকালে পুলিশ মরদেহ গ্রহণ করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। পরে মর্গ থেকে মরদেহ নিয়ে জেলা বিএনপির নেতারা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের নারী কর্মীরা তালিমের নামে জান্নাত পাওয়ার কথা বলে নারীদের স্বামীর অবাধ্য করে তুলছেন, যার ফলে অনেক পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। শনিবার এমন একটি অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ জানাতে গেলে সংঘর্ষ বাধে এবং এতে জামায়াতের কর্মীরা তরু মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
বিক্ষোভ মিছিল শেষে জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ বলেন, জামায়াতের কর্মীরা তরু মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তা না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।
বিক্ষোভ সমাবেশে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান, সহসভাপতি মুন্সি কামাল আজাদ, মুকুল বিশ্বাস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ বিশ্বাস, শাহাজান আলী ও আসিফ ইকবাল, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুর রহমান, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, জেলা যুবদলের সভাপতি আহসান কবির, সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সোমেনুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের হামদহ এলাকায় জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দলটির নেতারা। সেখানে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সদর উপজেলা জামায়াতের আমির মু. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, তরু মিয়ার মৃত্যু হয়েছে স্ট্রোকের কারণে। তাঁর দাবি, তরু মিয়া উচ্চ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। সংঘর্ষের সময় মারামারি ও রক্তপাত দেখে তিনি স্ট্রোক করেন এবং তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই।
তিনি আরও বলেন, সংঘর্ষের পর গান্না বাজারে জামায়াতের ছয় নেতা-কর্মীর দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে। রাতে ইউনিয়নের চণ্ডীপুর এলাকায় জামায়াতের কয়েকজন কর্মীকে মারধর ও বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগও করা হয়। পুলিশ একটি নারী কর্মীসহ চারজনকে আটক করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, তরু মিয়া হাসপাতালে আনার সময় তিনি বমি করছিলেন এবং তাঁর অবস্থা গুরুতর ছিল। দ্রুত ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সামসুল আরেফিন জানান, নিহত তরু মিয়ার ছেলে মো. শিপন মিয়া বাদী হয়ে ৫১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেছেন। এ ঘটনায় তিনজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শাহাদৎ হোসেন জানান, গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন হলেন মাধবপুর গ্রামের ফারজেল হোসেনের ছেলে জান্নাতুল ইসলাম (২৪), সিরাজুল ইসলামের ছেলে শহিদুল ইসলাম (৫৪) এবং পাইকপাড়া গ্রামের ইউসুফ আলী বিশ্বাসের ছেলে মো. মোকলেচুর রহমান (৫৫)।
সিএ/এমই


