বাগেরহাটের রামপালে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বর-কনেসহ ১৪ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের নয়জন রয়েছেন। তাঁরা হলেন বর, তাঁর বাবা, ভাই-বোন, ভাবি এবং ভাগনে-ভাগনিসহ ঘনিষ্ঠ স্বজনেরা। শুক্রবার (১৩ মার্চ) ভোরে তাঁদের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেহালাবুনিয়া এলাকায় পৌঁছায়। অপরদিকে কনে, তাঁর বোন, দাদি ও নানির মরদেহ নেওয়া হয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলায়।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১১ মার্চ) রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার (মিতু)-এর সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমানের (ছাব্বির)। কনের বাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বরপক্ষ মোংলার উদ্দেশে রওনা দেয়। বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৪ জন একটি মাইক্রোবাসে ছিলেন।
মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইবিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ ঘটনায় আহত একজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বর আহাদুর রহমান, তাঁর বাবা আবদুর রাজ্জাক, ভাই আবদুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া (ঐশী), ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম (জনি)-এর স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা (পুতুল), তাঁদের সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম। এছাড়া নিহতদের মধ্যে আছেন কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাসের চালক নাঈম। চালক নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর আহাদুর রহমান মোংলা শহরে একটি মুঠোফোনের দোকান পরিচালনা করতেন। কনে মার্জিয়া আক্তার কয়রার নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
নিহত উম্মে সুমাইয়ার শ্বশুর আবদুল আলীম বলেন, ‘রাজ্জাক ভাইয়ের (বরের বাবা) আদি বাড়ি কয়রায়। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম। তাঁরা বৃহস্পতিবার ১২টার পর রওনা দেন। আমার পুত্রবধূ, একমাত্র নাতিও দুর্ঘটনায় মারা গেছে।’
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে মোংলা উপজেলা পরিষদসংলগ্ন শেহালাবুনিয়ায় বরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষের ভিড়। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সেখানে জড়ো হন। চার নারীর মরদেহ রাখা হয়েছে আবদুর রাজ্জাকের বাড়ির ভেতরে। উপজেলা পরিষদ চত্বরে রাখা হয়েছে বাকি পাঁচজনের মরদেহ।
প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘একসাথে এতগুলো লাশ আগে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো না।’
নিহত আবদুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার বলেন, ‘আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তাঁর মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন কয়রায়। এই ছেলেরও সেখানে বিয়ে দিয়েছিলেন। দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারটা শেষ হয়ে গেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশপাশের ৯টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ করে একে একে নয় স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে। দুপুরে জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাঁদের জানাজা হবে। পরে পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে।’
সিএ/এমই


