খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের মসজিদকুঁড় গ্রামে কপোতাক্ষ নদের তীরে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর সাক্ষী মসজিদকুঁড় মসজিদ। খুলনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে সুন্দরবনসংলগ্ন এই গ্রামে অবস্থিত মসজিদটি এলাকার মুসলমানদের জন্য আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।
রমজান মাসে জুমার আজানের আগেই মসজিদ চত্বর মুসল্লিতে ভরে ওঠে। কোয়রার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পাশের আশাশুনি উপজেলা থেকে নামাজ পড়তে মানুষ আসে। খতিব মাওলানা মো. আমিরুল ইসলাম জুমার নামাজে ইমামতি করেন এবং নামাজ শেষে দেশ ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
স্থানীয়রা মসজিদে নামাজ পড়ার অনুভূতিকে আধ্যাত্মিক প্রশান্তির সঙ্গে তুলনা করেন। আশাশুনি থেকে আসা ইদ্রিস আলী বলেন, “প্রতিবছর অন্তত একবার এখানে আসার চেষ্টা করি। এটি পীরের মসজিদ হিসেবে পরিচিত। এখানে নামাজ পড়লে একধরনের মানসিক প্রশান্তি পাই।”
মসজিদটি নয় গম্বুজবিশিষ্ট এবং চুন-সুরকি ও পাতলা বর্গাকার ইট দিয়ে নির্মিত। প্রায় ৪৫ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদের প্রতিটি পাশের দৈর্ঘ্য ১৬.৭৬ মিটার, ভেতরের অংশের দৈর্ঘ্য ১২.১৯ মিটার। ভেতরের চারটি ইটের স্তম্ভ মসজিদের ভেতরকে নয়টি সমবর্গক্ষেত্রে ভাগ করেছে, প্রতিটি সমবর্গক্ষেত্রকে একটি করে গম্বুজ আচ্ছাদিত করেছে। কিবলামুখী দেয়ালে রয়েছে অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব।
মসজিদের প্রাঙ্গণে থাকা একটি পাথরের স্তম্ভে খোদাই করা লেখা থেকে নির্মাণকাল নির্ধারণ করা যায়নি। তবে স্থাপত্যশৈলীর সাদৃশ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, এটি হজরত খানজাহান আলী (রহ.)–এর সময় নির্মিত হয়েছে। মসজিদটি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে আছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪১৮ থেকে ১৪৩৩ সাল পর্যন্ত বাংলার সুলতান ছিলেন জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ শাহ। সে সময় খানজাহান আলী যশোরের মুড়লী পর্যন্ত এসে কাফেলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন। তাঁর সহচর বোরহান খাঁ ও তাঁর ছেলে ফতে খাঁ দক্ষিণের সুন্দরবনসংলগ্ন আমাদী এলাকায় যান। ধারণা করা হয়, তাঁদের উদ্যোগেই ১৪৪৫ সালের দিকে মসজিদকুঁড় মসজিদ নির্মিত হয়।
স্থানীয়রা মসজিদটি শুধু ইবাদতের স্থান হিসেবে নয়, দক্ষিণাঞ্চলের মুসলিম স্থাপত্য–ঐতিহ্যের মূল্যবান নিদর্শন হিসেবেও বিবেচনা করেন। নিয়মিত নামাজ আদায় করেন স্থানীয় বাসিন্দা জুলফিকার আলী। মসজিদে রমজানে জুমা, ইফতার ও তারাবিহের নামাজে শতাধিক মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন।
মসজিদটির দক্ষিণ-পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। পাশেই বেড়িবাঁধ এবং সিঁড়ি বেয়ে মসজিদে উঠতে হয়। ইমাম মো. আমিরুল ইসলাম জানান, আগে কেউ কেউ মনোবাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে মসজিদে আসতেন, তবে কুসংস্কারের কারণে তা বন্ধ করা হয়েছে।
সিএ/এমই


