দীর্ঘ ৫৬ বছর পর ভোটকেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা। স্থানীয়ভাবে বহু বছর ধরে নারীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে এবার সেই প্রথা ভেঙে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে দেখা গেছে নারী ভোটারদের উপচে পড়া ভিড়।
সরেজমিনে গৃদকালিন্দিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। ৭০ বছর বয়সী আয়েশা বেগম সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কেন্দ্রে আসেন ভোট দিতে। তিনি বলেন, ‘এই প্রথম ভোট দিতে এসেছেন। খুবই ভালো লাগছে।’ এত বছর কেন ভোট দেননি জানতে চাইলে বলেন, ‘নিষেধ ছিল। স্থানীয় লোকজন আমাদের বোঝানোর পর ভোট দিতে এসেছি।’
রূপসা ইউনিয়নের বাসিন্দা নূরজাহান বেগম জানান, তাঁর বিয়ে হয়েছে ৪৫ বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কখনো ভোট দেননি। এবার কেন এসেছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সবাই বলছে, তোমরা নারীরা বাজারে যাও, চাকরি কর, সবকিছুই কর তাহলে ভোট দিতে পারবা না কেন? ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়া হারাম নয়। তাহলে ভোট দিতে সমস্যা কোথায়। এখন আমাদের মধ্যেই উপলব্ধি এসেছে, এত দিন ভোট না দিয়ে আসলে ভুল করেছি। তাই ভোট দিতে এসেছি।’
গৃদকালিন্দিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এ কে এম লোকমান হাকিম জানান, এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৬০৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৮১১ এবং নারী ১ হাজার ৭৯২ জন। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৪০১টি, যার মধ্যে নারী ভোটার ১৫৯ জন।
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে মোট ভোটার ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ১০ হাজার ২৯৯ জন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক নারী ভোটারের অংশগ্রহণ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৬৯ সালে স্থানীয়ভাবে নারীদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর নির্বাচন কমিশন থেকে বিভিন্ন সময় উৎসাহ দেওয়া হলেও নারীরা কেন্দ্রে আসেননি। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় ইমাম, আলেম, মুয়াজ্জিন ও সাধারণ মানুষদের নিয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে নারীদের ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হয়।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের ভোট দেওয়া কোনো অপরাধ নয়। ৫৬ বছর আগে স্থানীয় পর্যায়ে সাময়িক নির্দেশনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে নারীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, যা বর্তমান সময়ে গ্রহণযোগ্য নয়।
চরমান্দারী শহীদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেখানে অর্চনা রানী বলেন, ‘এর আগে তিনি কখনো ভোট দেননি। এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিতে এসেছেন।’ তবে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আবদুস সামাদ জানান, আগে কখনো ভোট না দেওয়ায় অনেক নারী ভোটার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত নন। অনেকে লাইনে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ব্যালট দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কেও জানতে চেয়েছেন।
ওই কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ৬১৬ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ হাজার ২৭০ জন। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি। এখানেও নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।
বেলা ১১টার দিকে গৃদকালিন্দিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শনে যান পুলিশ সুপার রবিউল হাসান। তিনি বলেন, নারীদের বোঝানো হয়েছে যে ভোটকেন্দ্রে এলে পর্দা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। তারা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছে। জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান তিনি।
সিএ/জেএইচ


