দেশের শস্যভান্ডার আরও সমৃদ্ধ হলো ছয়টি নতুন উচ্চফলনশীল ধানের জাত যুক্ত হওয়ায়। এর মধ্যে রয়েছে দুটি হাইব্রিড ধান, ভিটামিন ই ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ একটি কালো চালের জাত, একটি স্বল্প লবণাক্ততা সহনশীল ও রোগ প্রতিরোধী জাত এবং হাওরাঞ্চলের জন্য উপযোগী একটি ঠান্ডা সহনশীল ধান। এসব জাত দেশব্যাপী চাষের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় গাজীপুরের বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত এসব জাত অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। এ সময় ব্রির মহাপরিচালক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ব্রি জানিয়েছে, নতুন ছয়টি জাত যুক্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভাবিত ধানের মোট জাতের সংখ্যা দাঁড়াল ১২৭টিতে। গবেষকদের মতে, এসব জাত দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নতুন জাতগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ব্রি ধান–১১৫। এটি বাংলাদেশের প্রথম উচ্চফলনশীল কালো চালের জাত, যা এন্থার কালচার পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত। এই ধান ভিটামিন ই ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ। জাতটির গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৭ দশমিক ৪ টন এবং জীবনকাল ১৩৭ থেকে ১৪২ দিন। ধানের দানা লম্বা ও চিকন, রং কালচে বাদামি এবং চাল কালো।
বোরো মৌসুমের জন্য নতুন উচ্চফলনশীল বিকল্প হিসেবে যুক্ত হয়েছে ব্রি ধান–১১৬। এটি একটি নাবি জাত এবং জনপ্রিয় ব্রি ধান–৯২–এর সমসাময়িক দীর্ঘ জীবনকালের ধান। এর গড় জীবনকাল ১৫৪ দিন। পাতা খাড়া ও লম্বা হওয়ায় শিষ সহজে দেখা যায় না এবং ধান পাকলেও পাতা সবুজ থাকে। এই জাতের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৫৯ টন, যা উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় ১০ দশমিক ৩৬ টন পর্যন্ত হতে পারে।
লবণাক্ততা ও রোগ প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের জন্য উল্লেখযোগ্য ব্রি ধান–১১৭। এটি বোরো মৌসুমের একটি স্বল্প লবণাক্ততা সহনশীল এবং ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৬ টন এবং ভালো পরিচর্যায় ৯ দশমিক ৯ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়। জীবনকাল গড়ে ১২৯ দিন, যা ব্রি ধান–২৮ এর সমান। দানার রং সোনালি, ভাত ঝরঝরে। এতে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং প্রোটিন ৯ দশমিক ৩ শতাংশ।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বিশেষভাবে উদ্ভাবিত হয়েছে ব্রি ধান–১১৮। প্রজনন পর্যায়ে এটি ঠান্ডা সহনশীল হওয়ায় আগাম বপনে ধান চিটা হওয়ার ঝুঁকি কম। ২৫ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বরের মধ্যে বপন করলে হেক্টরপ্রতি কমপক্ষে ৬ টন ফলন পাওয়া যায়। স্বাভাবিক সময়ে ১৫ থেকে ২০ নভেম্বর বপনে ১৪৫ দিনে ফলন ৬ দশমিক ৯ থেকে ৮ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত হতে পারে।
এ ছাড়া অবমুক্ত দুটি নতুন হাইব্রিড জাত হলো ব্রি হাইব্রিড ধান–৯ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান–১০। ব্রি হাইব্রিড ধান–৯ ঢলে পড়া প্রতিরোধী এবং মাঝারি মাত্রার লবণাক্ততা সহনশীল। এর জীবনকাল ১৪৫ থেকে ১৪৭ দিন। কৃষকের মাঠে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ দশমিক ৫ টন, আর উপকূলীয় এলাকায় ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ টন পাওয়া যায়। অন্যদিকে ব্রি হাইব্রিড ধান–১০ ঢলে পড়া প্রতিরোধী ও চিকন দানার জাত। এই ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৯ দশমিক ৭ থেকে ১০ দশমিক ৭ টন।
ব্রি উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ ও গবেষণা টিমের প্রধান খোন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় ৮ বছর কয়েকটি টিম একসঙ্গে কাজ করে জাতগুলো অবমুক্ত করা হয়েছে। নতুন ধানের জাতগুলো চাষাবাদ করলে কৃষকেরা লাভবান হবেন।
সিএ/এমই


