চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী ইউনিয়নে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং কয়েক হাজার মতুয়া ভক্তের পদচারণায় মুখরিত পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে শ্রী শ্রী পূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদ ঠাকুরের মাঘী পূর্ণিমা উৎসব।
১ ফেব্রুয়ারি (রবিবার) উপজেলার চরভৈরবী ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘শ্রী শ্রী পূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদ ঠাকুর মন্দির’ প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল ভক্তদের এক বিশাল মিলনমেলায়। মতুয়া সংকীর্তন, লীলামৃত পাঠ, মহোৎসব ও মহাপ্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে দিনটি অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হয়।
সরেজমিনে মন্দির প্রাঙ্গণ ঘুরে এবং স্থানীয় প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই উৎসবের শিকড় অনেক গভীরে। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে শ্রী শ্রী রাধাচরণ ক্ষ্যাপা গোস্বামী এই মন্দিরটি স্থাপন করেন। সেই থেকে সুদীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এখানে মাঘী পূর্ণিমা পালিত হয়ে আসছে। কালের পরিক্রমায় এই উৎসব এখন কেবল স্থানীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন চাঁদপুরসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর মতুয়া ভক্তদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়েছে।
প্রতি বছরের ন্যায় এবারও উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় শনিবার সন্ধ্যা থেকে। ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের ‘অধিবাসের’ মাধ্যমে মূল আয়োজনের সূচনা হয়। রবিবার প্রাতঃভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই ডঙ্কা, শঙ্খ ও কাঁসরের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। লাল নিশান হাতে নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত মতুয়া দল ‘হরিবোল’ ধ্বনিতে এলাকা প্রকম্পিত করে মন্দিরে সমবেত হতে থাকেন।

সকাল থেকেই শুরু হয় শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের লীলামৃত পাঠ। মতুয়া ভক্তরা তাদের প্রিয় পরমেশ্বরের গুণকীর্তন করে সংকীর্তনে মেতে ওঠেন। মন্দিরের ভেতরে ও বাইরে ভক্তদের বিপুল ভিড় থাকলেও আয়োজকদের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় পূজা-অর্চনা চলে নির্বিঘ্নে।
এই উৎসবে যোগ দিতে চাঁদপুর ছাড়াও লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন। লক্ষ্মীপুর থেকে আসা ভক্ত বিমল চন্দ্র, সমর ও সাধনা রানীসহ আরও অনেকে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “আমরা প্রতি বছর এই দিনটির জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করি। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা ভুলে এখানে এলে মনে এক অনাবিল শান্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি পাওয়া যায়। আমরা সংকীর্তনের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি, দেশের সমৃদ্ধি ও সকলের মঙ্গল কামনা করছি। এত মানুষের এই বিশাল সমাগম দেখে মনে হচ্ছে এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং আমাদের মতুয়া ভাই-বোনদের প্রাণের এক মহামিলনমেলা।
উৎসবের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আগত দর্শনার্থীরা। মন্দির কমিটির সভাপতি সুনীল বরণ সরকার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে উৎসব সম্পন্ন করতে আমরা মাসব্যাপী প্রস্তুতি নিয়েছি। প্রশাসনের অকুন্ঠ সহযোগিতা এবং স্থানীয় যুব সমাজের স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতায় হাজার হাজার ভক্তের মহাপ্রসাদ গ্রহণ, যাতায়াত ও অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। আমাদের পরম গুরু শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মূল আদর্শই ছিল ‘হাতে কাম, মুখে নাম’। অর্থাৎ কর্মের সাথে সাথে ঈশ্বরকে স্মরণ করা। এই মহতী বাণী ও মানবসেবার আদর্শ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের এই আয়োজনের প্রধান লক্ষ্য।
দুপুর গড়াতেই শুরু হয় উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘বিশাল মহোৎসব’। মন্দির প্রাঙ্গণে পংক্তি ভোজনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কয়েক হাজার মানুষের মাঝে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই উৎসবটি কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি এই অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। সকল ধর্মের মানুষের সহযোগিতা ও উপস্থিতিতে উৎসবটি একটি সর্বজনীন রূপ লাভ করে।
বিপুল পরিমাণ মানুষের সমাগম হওয়ায় নিরাপত্তা রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল কঠোর ব্যবস্থা। হাইমচর থানা পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যরা মন্দির ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে হাইমচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানান, “মাঘী পূর্ণিমা উপলক্ষে মন্দির এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভক্তদের আসা-যাওয়া এবং উৎসব পালনে যাতে কোনো ধরণের বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য আমাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ সদস্যরা সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বিকেলের পর থেকে শুরু হয় ধর্মীয় আলোচনা সভা। বিশিষ্ট পণ্ডিত ও ধর্মীয় আলোচকগণ হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবনী ও মতুয়া ধর্মের মূল দর্শনের ওপর আলোকপাত করেন। সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় সজ্জিত মন্দির প্রাঙ্গণে পুনরায় সংকীর্তন শুরু হয়। পরিশেষে গভীর রাতে বিশেষ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে এবারের উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। হাজারো ভক্তের হৃদয়ে প্রশান্তি আর আগামী বছর আবার ফিরে আসার আকুতি নিয়ে শেষ হয় এই ঐতিহ্যবাহী মাঘী পূর্ণিমা মেলা।
চাঁদপুর প্রতিনিধি
সিএ/জেএইচ


