রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ছুটির দিনেও জ্বালানি তেল নিতে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। শুক্রবার ( ৫ ডিসেম্বর) সকালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কোথাও কোথাও লাইনে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে তর্কবিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
পরীবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভিড় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। স্টেশনটির সামনে থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে হয়ে শাহবাগ মেট্রোরেলের নিচ পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। এত দীর্ঘ লাইনের কারণে ছুটির দিনেও ওই সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে লাইনে কে আগে যাবে তা নিয়ে কয়েকজন মোটরসাইকেলচালকের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। পরে তা হাতাহাতিতে গড়ায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্য চালক ও স্টেশন কর্মীরা এগিয়ে আসেন।
দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়েছেন উবারচালক নাজমুল হাসান। তিনি জানান, শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় ৫০ মিনিট অপেক্ষা করার পর তেল নিতে পেরেছেন। তিনি বলেন, এই সময়ের মধ্যে দু–তিনটি ভাড়া পেতে পারতেন। প্রতিদিন তাঁর ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল লাগে। অন্যদের কম তেলেও চললেও তাঁদের ক্ষেত্রে এই জ্বালানি ছাড়া কাজ চালানো সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, দু–এক দিনের মধ্যে তেল শেষ হয়ে গেলে কী হবে তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। কারণ উবার চালিয়েই তাঁর পরিবারের খরচ চলে।
তবে পরীবাগের ওই ফিলিং স্টেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক আহমেদ রুশদ জানান, তাঁদের স্টেশনে তেলের মজুতে কোনো ঘাটতি নেই। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষ কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে বেশি করে তেল নিচ্ছেন, তবে ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ স্বাভাবিক আছে।
এদিকে দৈনিক বাংলা মোড়ের বিনিময় ফিলিং স্টেশনে বেলা ১১টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা এবং প্রাইভেট কারে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। তেল দেওয়ার আগে স্টেশনের কর্মচারী মো. সাহেদ উদ্দিন ক্রেতাদের জানিয়ে দিচ্ছেন যে নির্ধারিত সীমার বেশি তেল দেওয়া হবে না।
সেখানে মোটরসাইকেলে তেল নিতে আসা সজীব রহমান জানান, তিনি ফরিদপুরের বাড়িতে যাবেন। এ জন্য অন্তত ৪ লিটার তেল প্রয়োজন। কিন্তু স্টেশনে এসে দেখেন তাঁকে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণ পাবলিক, আমাদের তেল দেওয়া যাবে না; অথচ যারা সরকারি জব করে, তারা তেল পায় কী করে? তারা আমাদের ট্যাক্সের টাকায় চলে।’
বিনিময় সার্ভিসিং সেন্টার ও ফিলিং স্টেশনের এক কর্মচারী জানান, তাঁদের স্টেশনে তেলের মজুত তুলনামূলক কম রয়েছে। তাই অল্প অল্প করে সবাইকে তেল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরের পাশে করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনেও মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। স্টেশনের কোষাধ্যক্ষ মো. সোহাগ বলেন, সাধারণত ছুটির দিনেও এত দীর্ঘ লাইন দেখা যায় না। তিনি জানান, ডিপো থেকে আগের তুলনায় কম তেল আসছে। আগে যাঁরা ২০০ থেকে ৪০০ টাকার তেল নিতেন, এখন অনেকেই ট্যাংক ফুল করে তেল নিচ্ছেন।
এই স্টেশনে তেল নিতে আসা ব্যাংককর্মী মো. মামুন হোসেন বলেন, তিনি তিনটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এখানে এসেছেন। অন্য স্টেশনগুলোতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছিল না। তাই এখানে এসে ট্যাংক পূর্ণ করে তেল নিয়েছেন।
রাজারবাগ সার্ভিস স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ যানবাহনকে তেল দেওয়া হচ্ছে না। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে কেবল অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশের গাড়ি, সরকারি যানবাহন এবং একেবারে তেল শেষ হয়ে যাওয়া কয়েকটি গাড়িকে তেল দেওয়া হচ্ছিল।
স্টেশনের কোষাধ্যক্ষ মো. মহিউদ্দিন বলেন, সাধারণত শুক্র ও শনিবার তাঁদের স্টেশনে ডিপো থেকে তেল সরবরাহ করা হয় না। তাই রিজার্ভে থাকা সীমিত তেল বিক্রি করতে হচ্ছে। আগে তিন গাড়ি তেল আসলেও এখন এক গাড়ি তেল পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি জানান। ফলে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
মিরপুরের দারুস সালাম এলাকার খালেক সার্ভিস সেন্টারেও তেল নিতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের চালকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও। যুদ্ধের প্রভাব বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। অনেকেই উদ্বেগ থেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন বলেও জানানো হয়েছে।
সিএ/এমই


