রাজধানীতে মশার উপদ্রব উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি এক ঘণ্টায় একজন মানুষের শরীরে গড়ে ৮৫০টি মশা কামড়াতে আসছে—যা বিশেষজ্ঞদের ভাষায় স্পষ্ট বিপৎসংকেত।
বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে আদাবরের একটি বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মশা তাড়াতে ব্যস্ত ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী রাশেদুল ইসলাম। ঘরে কয়েল জ্বলছে, ড্রয়িংরুমে অ্যারোসল ছিটানো—তবু উপদ্রব কমছে না। তিনি বলেন, ‘সারা দিন অফিস করে এসে একটু শান্তিতে বসব, সেই উপায় নেই। মনে হয়, ঘরে ঢুকলেই মশার ঝাঁক অপেক্ষা করে আছে। রাতে মশারির মধ্যেও ঢুকে পড়ে মশা।’
তাঁর আট বছরের ছেলের হাত-পায়ে কামড়ের দাগ ও ঘা দেখা গেছে। শিশুটির মা বলেন, ‘ও বুঝতেই পারে না কখন কামড়ায়। পরে দেখি লাল হয়ে ফুলে গেছে।’ তাঁদের ধারণা, এখন রাজধানীর বহু পরিবার একই সমস্যার মুখে পড়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে মশার ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। মার্চে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গবেষকেরা জানান, পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে—লার্ভা বা শূককীটের ঘনত্ব পরীক্ষা এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি গণনা। বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি সংগ্রহ করে লার্ভা গণনায় জানুয়ারিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া যায়, যা ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ১ হাজার ২৫০-এ।
প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি যাচাইয়ে একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮৫০।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেই বিশ্বমানে তা বেশি। সেখানে ঢাকায় ৮৫০টি, এটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি বিপৎসংকেত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যৌথ পর্যবেক্ষণে রাজধানীর পাঁচ এলাকায় ২৪ ঘণ্টা ফাঁদ পেতে মশা সংগ্রহ করা হয়। ১৬ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া যায় ১৭ হাজার ১৫৯টি মশা। ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একই এলাকায় পাওয়া যায় ২২ হাজার ৩৬২টি মশা। এলাকাগুলো হলো উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের পার্ক, মিরপুর ২–এর ডিএনসিসি ভান্ডার শাখা অফিস, গুলশান ১–এর পুরাতন ভান্ডার শাখা অফিস, মিরপুর ১–এর ১০ নম্বর ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টার ও মোহাম্মদপুরের আঞ্চলিক অফিস।
গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর সব এলাকায় সমানভাবে মশা নেই। কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর, রায়েরবাজার, উত্তরা ও সাভারে ঘনত্ব বেশি। তুলনামূলকভাবে শাহবাগ ও পরীবাগ এলাকায় কম।
বাংলাদেশে কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস—এই তিন প্রজাতির মশা বেশি দেখা যায়। কিউলেক্সের কামড়ে ফাইলেরিয়া ও জাপানি এনসেফালাইটিস হতে পারে, এডিসের মাধ্যমে ডেঙ্গু এবং অ্যানোফিলিসে ম্যালেরিয়া ছড়ায়। আইসিডিডিআরবি’র বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, জাপানি এনসেফালাইটিসে মৃত্যুর অনুমিত হার ২৫ শতাংশ। দেশে এটি ব্যাপক না হলেও অতীতে কিছু অঞ্চলে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছর শীতের তীব্রতা কম ছিল এবং দ্রুত তাপমাত্রা বেড়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান বলেন, অতীতে মার্চের মাঝামাঝি থেকে কিউলেক্সের উপদ্রব বাড়লেও এ বছর তা ফেব্রুয়ারি থেকেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামীকাল থেকে বৈশাখের আগমন পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি এবং গড় তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও নর্দমা-জলাশয়ের দূষণ কিউলেক্স বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
ডিএনসিসি এলাকার প্রায় আট হাজার বিঘা জলাশয়ের বড় অংশই মশার উৎপত্তিস্থল। ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, একবার পরিষ্কার করলে দ্রুতই আবার আবর্জনায় ভরে যায়। জলাশয় ব্যবস্থাপনা সত্যিই খুব জটিল। তিনি আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
সিএ/এমই


