রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রকৃত নারীনেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে প্রায়ই এমন ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়, যাঁদের স্বামীরা জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। এতে নারীদের প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। তিনি বলেন, এখন আর নারীরা সংসদে করুণার আসন বা দয়ার সিট চান না; তাঁরা চান প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম।
ফরিদা আখতার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সংরক্ষিত নারী আসনকে অনেক সময় দাদি–চাচিদের জন্য বরাদ্দ রাখে। যেসব পুরুষ প্রার্থী নির্বাচনে পরাজিত হন, তাঁদের স্ত্রীদের সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া হয়। তাঁর মতে, এই ধরনের প্রক্রিয়ায় সংসদে নারীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব গড়ে ওঠে না।
তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি মনোনয়ন দেওয়ার সময় অন্তত ৩০ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনীত করে, তাহলে ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রয়োজনীয়তা আর থাকবে না। যেসব নারী দলীয় মনোনয়ন না পেয়েও নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তাঁদেরও অভিনন্দন জানান তিনি।
ফরিদা আখতার আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নারী প্রার্থীদের কম মনোনয়ন দিলেও নির্বাচন কমিশন কেন এ বিষয়ে নীরব ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারীদের নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী এলাকা থাকে না। ফলে তাঁরা আসলে কাদের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং কার স্বার্থ সংসদে তুলে ধরেন—সে প্রশ্নও থেকে যায়।
সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের বর্তমান পদ্ধতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘…এখন আর আমরা করুণার আসন চাই না। দয়ার সিট চাই না।…আমরা চাই সত্যিকারের নারীর প্রতিনিধিত্ব।’ প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন ঋতু সাত্তার। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের প্রধান বিরোধী দলে কোনো নারী সদস্য নেই। এ বিষয়টি নিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে নিন্দা জানানো হয়।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, নির্বাচনের আগে নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে আলোচনা থাকলেও নারীদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এসব অনিয়ম ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। তিনি জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানান।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে বুলিং ও হেনস্তা বন্ধে বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন ফারাহ কবির। তিনি বলেন, ফেসবুকসহ বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এই ধরনের হয়রানি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি। অনলাইনে হয়রানির শিকার হলেও নারীরা যাতে পিছিয়ে না পড়েন, সে আহ্বানও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া নারীরা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ কম থাকায় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও নারীরা বঞ্চিত হন। তাঁর মতে, মনোনয়ন দেওয়ার প্রক্রিয়াটি মূলত পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এই বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
নারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ কম হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, পুরুষ প্রার্থীরা বিভিন্ন উৎস থেকে সহজে আর্থিক সহায়তা পেলেও নারী প্রার্থীদের সেই সুযোগ সীমিত। পাশাপাশি অনলাইনে নারী প্রার্থীরা তীব্র সাইবার আক্রমণের শিকার হন, যা অনেককে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন ও নারীপক্ষের সদস্য সাদাফ সাজ সিদ্দিকী। ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, বিভিন্ন অঙ্গনে নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে হবে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সিনিয়র ফেলো অব প্র্যাকটিস মাহিন সুলতান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আন্দোলন চলমান। কিন্তু এখনো সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে একই ধরনের আন্দোলন করতে হচ্ছে। তিনি মনে করেন, দল থেকে নারীরা কেন মনোনয়ন পাচ্ছেন না, সেই কারণগুলোও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
শেরপুর-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা অভিযোগ করেন, নির্বাচনে তিনি সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ পাননি। নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানালেও কোনো প্রতিকার পাননি বলেও জানান তিনি।
ঢাকা-১২ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ কম থাকায় নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্বও কম থাকে। তিনি নারীদের আরও বেশি করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব বলেন, বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রকৃত জনবান্ধব রাজনীতি করা মানুষের সংসদে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। অর্থের প্রভাব ও ক্ষমতার রাজনীতি এখানে বড় ভূমিকা রাখে, যা নারী প্রার্থীদের জন্য আরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ঢাকা-৫ আসনে বাসদের (মার্ক্সবাদী) প্রার্থী শাহিনুর আক্তার সুমি, ঢাকা-১০ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বহ্নি বেপারী, ঢাকা-১১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কহিনূর আক্তার বীথি, ঢাকা-৭ আসনে বাসদের (মার্ক্সবাদী) প্রার্থী সীমা দত্ত এবং ঢাকা-২০ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাবিলা তাসনিদসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।
সিএ/এমই


