ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে মেহেরপুর শহরের বাজারগুলোতে জমে উঠেছে কেনাকাটা। সাধারণত শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শহরের রাস্তাঘাটে কিছুটা নীরবতা দেখা গেলেও এবার সেই চিত্র বদলে গেছে। সকাল থেকেই বড় বাজার, মল্লিকপাড়া ও হোটেল মোড় এলাকার বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দোকানগুলোতে ক্রেতাদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে বিক্রেতাদের। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে দরজির দোকানগুলোতে, যেখানে নতুন অর্ডার নেওয়া বন্ধের ঘোষণা ঝুলছে।
শুক্রবার ( ৫ ডিসেম্বর) সকাল থেকে শহরের ঐতিহ্যবাহী বড় বাজার এলাকায় অবস্থিত শতবর্ষী কাপড়ের দোকান আগারওয়াল বস্ত্রালয়ে ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। দোকানের স্তূপ করা কাপড়ের মধ্য থেকে নিজের পছন্দের পোশাক খুঁজে নিতে ব্যস্ত ছিলেন অনেকেই। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোহন কুমার চৌধুরী বলেন, ‘অন্যান্য শুক্রবারে আমরা সাধারণত দোকান বন্ধ রাখি। এবার ঈদের কেনাকাটার যে জোয়ার শুরু হয়েছে, তাতে ক্রেতাদের সুবিধার্থে আজ দোকান খুলে রাখতে হয়েছে। এবার বাজারে পাকিস্তানি সালোয়ার-কামিজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে সিল্ক, সুতি, অরগেন্ডি আর টিস্যু কাপড়ের সালোয়ার-কামিজের চাহিদাও কোনো অংশে কম নয়।’
এবারের ঈদে মেহেরপুরের নারীদের কেনাকাটায় আভিজাত্য ও আরামের সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। সুতি ও ভয়েল কাপড়ের বাহারি নকশার পাকিস্তানি ও ভারতীয় লন সেট বেশ জনপ্রিয়। তরুণীদের মধ্যে হালকা নীল, গোলাপি ও হালকা সবুজ রঙের আনারকলি স্যুটের চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী শারারা ও গারারা সেট, স্ট্রেইট কাট সিল্ক স্যুট এবং কুর্তার সঙ্গে চওড়া পালাজ্জোও অনেকের পছন্দের তালিকায় রয়েছে। গরমের কারণে ফ্লোরাল প্রিন্টের সুতি কাপড়ের পোশাকও ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
পুরুষদের পোশাকেও দেখা যাচ্ছে নতুন ধারা। তরুণদের মধ্যে ড্রপ শোল্ডার ডিজাইনের পাঞ্জাবি ও শার্ট বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফ্যাশনে নতুনত্বের কারণে ট্রাউজার বা জিনস হিসেবে বুটকাট প্যান্টের চাহিদা বাড়ছে। অনেক ক্রেতা আবার এমব্রয়ডারি করা সুতি পাঞ্জাবি, পাঠান স্যুট বা হালকা কাজের শেরওয়ানিও পছন্দ করছেন।
অন্যদিকে শহরের বিভিন্ন দরজির দোকানে কারিগরদের ব্যস্ততা এখন চরমে। দিন-রাত মেশিনের শব্দে মুখর থাকলেও অনেক টেইলার্স দোকানের সামনে ‘অর্ডার নেওয়া বন্ধ’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছেন। কেশবপাড়া এলাকার শাপলা টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী হাসেম মিয়া বলেন, ‘আগে যে অর্ডারগুলো নিয়েছি, সেগুলো ঈদের আগে শেষ করা নিয়েই এখন দুশ্চিন্তা। নতুন অর্ডার নিলে সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।’
কাপড় কিনে অনেক ক্রেতাই এখন দরজির দোকানে ঘুরছেন, কিন্তু বেশির ভাগ কারিগরই জানিয়ে দিচ্ছেন—এ মুহূর্তে নতুন অর্ডার নিলে ঈদের আগে পোশাক তৈরি করে দেওয়া সম্ভব নয়। এতে অনেকেই বিপাকে পড়েছেন।
পৌর শহরের বাসিন্দা ইরানি আক্তার বলেন, ‘শ্বশুরবাড়ি, মামাবাড়ি আর বাবার বাড়ি মিলিয়ে পাঁচটি সালোয়ার–কামিজ পেয়েছি। কিন্তু এখন ভালো দরজি নতুন অর্ডার নিচ্ছেন না। কীভাবে পোশাক বানাব, বুঝতে পারছি না।’
শুক্রবার বিকেলের দিকে বাজারে ভিড় আরও বাড়তে দেখা গেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পোশাকের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতি বেশি ছিল। দাম কিছুটা বেশি হলেও কেনাকাটায় তার খুব বেশি প্রভাব পড়েনি।
ক্রেতা সুমি আক্তার বলেন, ‘বাচ্চাদের কাপড় কেনা শেষ করেছি। এখন নিজের জন্য শাড়ি ও থ্রি-পিস দেখছি। তবে গত বছরের তুলনায় কাপড়ের দাম বেশি মনে হচ্ছে। আর দরজিরা অর্ডার না নেওয়ায় একটু সমস্যায় পড়েছি।’
বড় বাজারের কয়েকটি বস্ত্রবিতান ঘুরে দেখা গেছে, মেয়েশিশুদের মধ্যে সালোয়ার-কামিজ, ফ্রক, টিউনিক, ঘাগরা-চোলি, ওয়ান–পিস, টু–পিস ও থ্রি–পিসের চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া সারারা, খাটো কামিজ ও লেহেঙ্গা ধাঁচের স্কার্টও জনপ্রিয়। আগে ফ্রক ও টিউনিক বেশি বিক্রি হলেও এবার সালোয়ার-কামিজ ও ঘাগরা-চোলির দিকে ঝোঁক বেশি। ছেলেশিশুদের জন্য পাঞ্জাবি–পাজামা, কাবলি পাঞ্জাবি, টি-শার্ট, পোলো শার্ট ও ফতুয়ার চাহিদা বেশি দেখা গেছে। পাশাপাশি হাফহাতা, ফুলহাতা ও থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টও বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে বাড়তি ভিড়ের কারণে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে বড় বাজার ও হোটেল মোড় এলাকায় রিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলের জটলা সামলাতে ট্রাফিক পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
মেহেরপুর জেলা দোকান মালিক সমিতি জানিয়েছে, ঈদের কেনাকাটায় ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সতর্ক রয়েছে। ঈদের আগে প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। উৎসবের আমেজে এখন প্রাণ ফিরে পেয়েছে একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাচীন জনপদ।
সিএ/এমই


