নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চাঁদা না দেওয়ায় একটি রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। হামলায় প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, নগদ অর্থসহ প্রায় এক কোটি ১৭ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে। তবে এজাহারে লুটের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সম্প্রতি উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রতিষ্ঠানটির নাম বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ। এখানে জিআই তার উৎপাদন করা হয়, যা সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিসহ ১২টি দেশে রপ্তানি হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কারখানার মালিক শারীরিক প্রতিবন্ধী মনোয়ার হোসেন ওরফে অপু (৪৩)।
কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে একদল ব্যক্তি কারখানায় ঢুকে কর্মীদের মারধর, ভাঙচুর এবং ট্রাক এনে মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে লুটপাট চলে। হামলার পর দুই দিন উৎপাদন বন্ধ থাকে। পরে শিল্প পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়।
কারখানা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান হুমায়ুনের নাম ব্যবহার করে এককালীন ১০ লাখ টাকা ও মাসিক ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। দাবি পূরণ না করায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।
মনোয়ার হোসেন বলেন, রূপগঞ্জ থানা থেকে কারখানায় পৌঁছাতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করার পরও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নেয়। ততক্ষণে হামলাকারীরা চলে যায়।
কারখানার তিন শ্রমিক ও স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হামলাকারীরা শাবল দিয়ে প্রধান ফটক ও সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। বাধা দিতে গেলে ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ খানকে মারধর করা হয়। তাকে বাঁচাতে গেলে কর্মচারী জুলহাস উদ্দিনও আহত হন। পরে তাদের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। হামলাকারীরা সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর, আসবাবপত্র নষ্ট এবং মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল ট্রাকে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় মনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এজাহারে বলা হয়েছে, স্থানীয় বেলায়েত আকন্দ, সজল হোসেন ও কাজল মিয়ার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায়। মামলায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া কাজল আকন, নিশাত আকন, মো. সজল হোসেন, সাদিকুল, মো. ফাহিম, আজিজ মৌলভি ও বোরহানউদ্দিনসহ একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
মনোয়ার হোসেনের দাবি, বেলায়েত আকন ও নিশাত আকন সভাপতি মাহফুজুর রহমানের নাম ব্যবহার করে দফায় দফায় চাঁদা দাবি করেছেন। তিনি বলেন, অন্তত চারবার বিষয়টি মাহফুজুর রহমানকে জানিয়েছেন। তবে তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো মীমাংসার প্রস্তাব দেন। মামলার সময় মাহফুজুর রহমানকে হুকুমের আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাম বাদ না দিলে মামলা নেবেন না বলে জানান। পরে বাধ্য হয়ে তার নাম বাদ দেন।
রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. সবজেল হোসেন বলেন, তিনি কারও নাম বাদ দিতে বলেননি, বরং মামলায় সত্য ঘটনা তুলে ধরতে বলেছেন।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘কারখানা মালিকের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তাঁকে কোনো দিন দেখিনি। ফলে চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি আমাকে চার দফায় জানানোর দাবি পুরোপুরি মিথ্যা। জানালে আমি ব্যবস্থা নিতাম। ঘটনার দিন থানা থেকে ফোন পেয়ে আমি বরং খোঁজ নেওয়ার জন্য তিনজনকে পাঠাই। পরে শুনি এ তিনজনের নামে মামলা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, কারখানাটিতে পরিবেশ দূষণকারী ব্যাটারি উৎপাদন করা হয় বলে শুনেছেন এবং এ কারণে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ।
এ বিষয়ে মনোয়ার হোসেন বলেন, তিনি সরাসরি নয়, লোক মারফত বিষয়টি জানিয়েছেন। আর তার কারখানায় শুধুই রপ্তানিমুখী জিআই তার উৎপাদন হয়, ব্যাটারি উৎপাদনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য গতকাল বিকেলে মাহফুজুর রহমানের পরিচয় দিয়ে দুই দফা হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জানা গেছে, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার নির্দেশ দেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী। পরে স্থানীয় জিন্দাপার্ক এলাকা থেকে প্রধান আসামি বেলায়েত আকনকে গ্রেপ্তার করা হলেও কিছুক্ষণ পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে এ বিষয়ে বেলায়েত আকনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ সুপার বলেন, তিনি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং বিস্তারিত জানতে রূপগঞ্জ থানার ওসির সঙ্গে কথা বলতে বলেন। ওসি মো. সবজেল হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। অন্য সংস্থায় মামলাটি হস্তান্তরের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। আসামি ধরেও ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, সেখানে অনেক লোক ছিল, প্রধান আসামিকে ধরে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়; কৌশলে কেউ সরে যেতে পারে।
ঘটনার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একাধিক ব্যবসায়ী জানান, নিয়মিত কম-বেশি চাঁদা দিতে হলেও এভাবে হামলা ও লুটের ঘটনা তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মামুন মাহমুদ বলেন, যে ধরনের অভিযোগ এসেছে তা সত্য হলে এটি ফৌজদারি অপরাধ। জড়িতরা যত বড় নেতাই হোক, দল তাদের অপরাধী হিসেবেই দেখবে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, আমরা চাইব বিষয়টি আইনগতভাবে দেখা হোক। দল থেকেও আমরা এ ঘটনার তদন্ত করব এবং তদন্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
সিএ/এএ


