সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলা ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত একটি সংবাদপত্র ভবন ঘিরে আয়োজন করা হয়েছে ব্যতিক্রমী শিল্পপ্রদর্শনী ‘আলো’। বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দ্বিতীয় দিনে সকাল ও বিকেলে নানা শ্রেণি-পেশা ও বয়সের দর্শনার্থীরা প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। ধ্বংসস্তূপের ভেতর শিল্পের ভাষায় প্রতিরোধ ও পুনর্জাগরণের বার্তা তাঁদের মনে বিস্ময় ও মর্মবেদনার পাশাপাশি নানা প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে।
প্রদর্শনীতে পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল-চেয়ার, বই ও নথিপত্রের ধ্বংসাবশেষকে শিল্পরূপ দেওয়া হয়েছে। দর্শকেরা ধ্বংসের চিহ্নের পাশাপাশি সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোর প্রতীকী শক্তিও দেখতে পান। অনেকেই উগ্রবাদী হামলার পুনরাবৃত্তি রোধ, দোষীদের বিচার এবং সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বিকেলে প্রদর্শনী দেখতে আসেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথম আলোতে হামলার এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনা একটি গহিন ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এ রকম ঘটনা নিয়ে এমন একটি প্রদর্শনী খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে স্মৃতিগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জানা জরুরি। দেশ ও জাতির জন্য এ ধরনের ঘটনার স্মৃতিকে ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে ধরে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন পূরণের কারণেও প্রদর্শনীটি তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, প্রথম আলোর ওপর হামলার ক্ষেত্রে দুটো ঘটনা রয়েছে। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানটি মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় বিস্ময়করভাবে রাষ্ট্রীয় নিস্পৃহতা দেখা গেছে। ‘এই দুই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এখন আমরা এর ব্যাখ্যা পেতে চাই। কারণ, ওই ঘটনা কোনো সুস্থতার ইঙ্গিতবাহী ছিল না। এর পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনোই না ঘটে, তার জন্যই প্রশ্নগুলোর সমাধান দরকার। আশা করি, এখন যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, সেই সময়ে প্রথম আলোর ওপর আসা সীমাহীন নির্মমতার কারণ অনুসন্ধান হবে।’
প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি এবং চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে উগ্রবাদী হামলা ও অগ্নিসংযোগে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ধ্বংসাবশেষ দিয়েই শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান নির্মাণ করেছেন এই শিল্প-আয়োজন।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, এটি শুধুই প্রদর্শনী নয়। উগ্রবাদী তাণ্ডব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হামলা, পরিবেশ ধ্বংস করা—এমন সবকিছুর বিরুদ্ধেই এটি একটি দারুণ শৈল্পিক প্রতিবাদ। এই প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে দর্শকদের কিছু বলে দিতে হবে না। তাঁরা নিজেরাই বুঝতে পারবেন কী হয়েছে আর এখন কী করণীয়। শিল্পীর ভাষা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে এই প্রদর্শনীতে প্রকাশিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কারুশিল্প বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শিল্পী ফারহানা ফেরদৌসী বলেন, ‘এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের কাজ সম্পর্কে আমরা অনেক দিন থেকেই জানি। এমন একটি পরিবেশে এত বিশাল কাজ তাঁর পক্ষেই করা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। এর জন্যই তো এত আন্দোলন-সংগ্রাম, এত আত্মদান। প্রত্যাশা থাকবে নতুন সরকার গণতন্ত্রকে প্রকৃতপক্ষেই অর্থবহ করতে সংবাদপত্র ও মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ডয়চে ভেলের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হারুন-উর রশিদ প্রদর্শনী ঘুরে বলেন, এই প্রদর্শনী একদিকে যেমন যন্ত্রণাময়, তেমনি অন্যদিকে অনুপ্রেরণাদায়ক।
অনেক তরুণ শিক্ষার্থীও প্রদর্শনী দেখতে আসেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের শুআইব ত্বাসীন, বিইউপির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের হুমায়রা তাবাসসুম এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের রাহাত এহসান। তাঁরা প্রদর্শনী নিয়ে মুগ্ধতার কথা জানান এবং দেশে মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে উগ্রপন্থা, মব সন্ত্রাস ও বিদ্বেষমূলক উসকানি বন্ধে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বনানীর একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মিঠুন কাজী বাসায় ফেরার পথে প্রদর্শনী দেখতে এসে ভবনের ভেতরের ধ্বংসচিত্র দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, হামলার ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু লোক তাদের হীনস্বার্থে সাধারণ মানুষকে উসকানি দিয়ে অনেক নাশকতামূলক কাজ করিয়েছে। তারই নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে সংবাদপত্র অফিসের ওপর এমন হামলায়।
এদিন প্রদর্শনী দেখতে আরও আসেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম কাদের, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিনিধি আগনেস দোকা এবং ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোর স্ত্রী পাওলা বেলফিউরে। পাওলা বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে যা ঘটেছিল, তা স্মরণে রাখা, স্মৃতিকে ধরে রাখার খুব সুন্দর উপায় এই প্রদর্শনী।
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সাংবাদিক এনামুল হক ছেলেকে নিয়ে প্রদর্শনীতে এসে বলেন, এটি একটি বীভৎস ও ধ্বংসাত্মক ঘটনা। দেশের ইতিহাসে সংবাদপত্রের ওপর এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি। এটি প্রতিরোধে সে সময়ের সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি।
সিএ/এমই


