ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের একটিতেও জিততে পারেননি জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনীত প্রার্থী। দীর্ঘদিন ধরে রংপুরকে নিজেদের রাজনৈতিক ‘দুর্গ’ হিসেবে দাবি করা দলটি এবার চরম ভরাডুবির মুখে পড়েছে। এক সময় দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাত ধরে গড়া শক্ত ভিত এবারের নির্বাচনে কার্যত তছনছ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দলটির প্রার্থীরা হারিয়েছেন জামানতও।
নির্বাচনের ফলাফলের পর বৃহস্পতিবার রাতেই ‘জাতীয় পার্টির জানাজা’ শিরোনামে একটি ব্যঙ্গাত্মক ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃণমূলে নেতৃত্ব সংকট, বিভাজন, ভোটারদের সঙ্গে নেতাদের মৌসুমি সাক্ষাৎ, আস্থাহীনতা এবং জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ—এগুলো মিলিতভাবে এই পরাজয় ডেকে এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু পরাজয় নয়, বরং রংপুরে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সতর্কবার্তা। পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে হলে তৃণমূল সংগঠন পুনর্গঠন, তরুণ নেতৃত্ব তৈরি এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় ‘দুর্গ’ স্থায়ীভাবে হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ফলাফলে দেখা গেছে, রংপুর-২ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিছুল ইসলাম মন্ডল পেয়েছেন মাত্র ৩৩ হাজার ৯৩০ ভোট। জামায়াতের এটিএম আজহারুল ইসলাম ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৩৮ ভোট।
রংপুর-৩ আসনে দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৯০ ভোট, জামায়াতের মাহবুবুর রহমান বেলাল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির সামসুজ্জামান সামু পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৯৮ ভোট।
রংপুর-৪ আসনে জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৬৬৪ ভোট। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির আখতার হোসেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট।
রংপুর-৫ আসনে জাতীয় পার্টির এসএম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর পেয়েছেন ১৬ হাজার ৪৯০ ভোট। জামায়াতের গোলাম রব্বানী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪১১ ভোটে জয়ী হয়েছেন। বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক মো. গোলাম রব্বানী পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১১৬ ভোট।
রংপুর-৬ আসনে জাতীয় পার্টির নুর আলম মিয়া পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ২৮৭ ভোট। এখানে জামায়াতের মাওলানা মো. নুরুল আমিন ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির সাইফুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট। এছাড়া শেখ হাসিনা লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী নুর মোহাম্মদ মন্ডলের কাছে হেরেছেন।
একই ধরণে কুড়িগ্রামের চারটি আসন, গাইবান্ধায় পাঁচটি, লালমনিরহাটে তিনটি, নীলফামারীতে চারটি, পঞ্চগড়ে দুটি, ঠাকুরগাঁওয়ে তিনটি ও দিনাজপুরের ছয়টি আসনেও জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক ভরাডুবি ঘটেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জাপা রংপুর অঞ্চল থেকে ১৭টি, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ২১টি, ২০০১ সালে ১৪টি, ২০০৮ সালে ১২টি, ২০১৮ সালে ৭টি এবং ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনে মাত্র ৩টি আসন পায়। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃত্বে সংকট, সংগঠন অকার্যকর হওয়া এবং প্রার্থী নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্ত এই ভরাডুবির মূল কারণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর রংপুর ছাড়া কোনো গ্রহণযোগ্য ও ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। তৃণমূলের কমিটি নিষ্ক্রিয় হওয়ায় নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে জাপার কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা নেই। বিএনপি ও জামায়াত সংগঠনের মাঠে সক্রিয়তা এবং সাবেক ভোটব্যাংকের বিচ্যুতি জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক জায়গা সংকুচিত করেছে।
স্থানীয় ভোটার রাশেদা বেগম জানান, জাপা বহু বছর এই এলাকায় এমপি দিয়েছে, কিন্তু কর্মসংস্থান ও শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। তাই মানুষ এবার পরিবর্তন চেয়েছে। তরুণ ভোটার সোহেল রানা বলেন, আমরা উন্নয়ন ও জাতীয় রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান দেখতে চাই, জাপা বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।
সিএ/এমই


