জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ১৭ মাসে সারা দেশে ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।
এই তথ্য জানানো হয়েছে সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর প্রতিবেদনে। আজ সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন মাকামের সমন্বয়ক মোহাম্মদ আবু সাঈদ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মাকামের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ইমরান হুসাইন তুষার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১৩৪টি মাজারে হামলার খবর পাওয়া গেলেও অনুসন্ধান করে ৯৭টিতে হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাকি ৩৭টি হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, এর মধ্যে ৬টি গুজব শনাক্ত হয়েছে।
৯৭টির মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা মোট ঘটনার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। জেলার মধ্যে কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি ১৭টি হামলা হয়েছে, নরসিংদীতে ১০টি এবং ঢাকায় ৯টি। আট বিভাগের মধ্যে ঢাকায় ৩৬টি, চট্টগ্রামে ২৮, সিলেটে ৯, ময়মনসিংহে ৮, রাজশাহীতে ৬, খুলনায় ৫, রংপুরে ৩ ও বরিশালে ২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
হামলার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৯টি হামলা ধর্মীয় মতবিরোধ, ২১টি স্থানীয় বিরোধ, ১৬টি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে হয়েছে এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে ১টি হামলা ঘটেছে। হামলার ধরনে পার্থক্য থাকলেও প্রায় সব ঘটনার পেছনে ‘তৌহিদী জনতা’-এর উপস্থিতি ও নেতৃত্ব ছিল। ভিডিও বিশ্লেষণে অন্তত ২৩টি ঘটনায় “নারায়ে তাকবির” স্লোগান উচ্চারিত হয়। মাজারে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭টি মসজিদেও হামলা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা তুলে ধরে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ১৩টি হামলায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের স্থানীয় নেতা-সমর্থকেরা জড়িত। এছাড়া ৪টি ঘটনায় বিএনপি, ৪টিতে জামায়াতে ইসলামী, ২টিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ১টিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি ও ১টিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা-সমর্থকেরা জড়িত।
হামলায় তিনজন নিহত এবং ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৩১, ঢাকায় ১৮০, ময়মনসিংহে ১৫৩, সিলেটে ৪৪, বরিশালে ৩৭ ও খুলনায় ২৩ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২ জন ঢাকার, ১ জন ময়মনসিংহের।
সংবাদ সম্মেলনে হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। ১০টি ঘটনায় হামলার আগে মাইক ব্যবহার করা হলেও পূর্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই ঘটনায় ১১টি মামলাও হয়েছে।
হামলার শিকার ৪৪টি মাজার বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এসব মাজারে বার্ষিক ওরস আয়োজন বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ৬টি মাজার বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
মাকামের সমন্বয়ক আবু সাঈদ বলেন, প্রতিবেদন তৈরির পাশাপাশি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মাজার, দরগাহ, খানকাগুলোকে ক্ষতিপূরণ, পুনঃসংস্কার কার্যক্রম এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ১২টি রাজনৈতিক দলকে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যা সব দল গ্রহণ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আইনি সহায়তা কেন্দ্র ব্লাস্টের প্রতিনিধি আহমেদ ইব্রাহীম, মাকাম গবেষণা দলের সদস্য তৌহিদুল ইসলাম, আবু হাসান মুহাম্মদ মুখতার, হামলার শিকার মুর্শিদপুর দরবারের প্রতিনিধি মাওলানা মতিউর রহমান, চাঁদপুরী শাজ শাহ দরবারের প্রতিনিধি মাওলানা গোলাম জিলানী প্রমুখ।
সিএ/এমই


