ফসলের মৌসুমে নির্বাচনের সময় গ্রামবাংলার মাঠে ভোটের আলাপও উঠে আসে। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো জয়পুরহাট-২ আসনের কালাই উপজেলার মাঠেও এখন আগাম জাতের আলু তোলার ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যায়। ভোর থেকে কৃষকরা জমি থেকে আলু তুলে বিক্রি করছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কৃষকের মুখে ঘুরছে ভোট, সরকার এবং নিজেদের কষ্টের কথাও।
রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে কালাই উপজেলার মূলগ্রাম মাঠে কৃষকেরা আলু তুলছিলেন। কৃষকরা চাচ্ছেন আসন্ন নির্বাচনে যেই সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তারা যেন কৃষকের কথা ভাবেন, ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করেন এবং এলাকায় সরকারি হিমাগার নির্মাণ করেন।
কালাই উপজেলার আঁওড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাফি প্রায় ৭০ শতাংশ জমিতে আগাম আলু চাষ করেন। কয়েক সপ্তাহ আগে প্রতি মণ আলুর দাম ছিল ৮০০ টাকা, যা পরদিন নেমে আসে মাত্র ৩০০ টাকায়। তিনি বলেন, ‘ভোট আসে, ভোট যায়, কিন্তু কৃষকের ভাগ্য বদলায় না। তবু আশা থাকে ভোট যেন শান্তিপূর্ণ হয়। সার ও কীটনাশকের দাম কমানো, ফসলের ন্যায্যমূল্য ও বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং সরকারি হিমাগার নির্মাণই কৃষকের অবস্থার উন্নতি করতে পারে।’
আক্কেলপুর উপজেলার মেলা গোপিনাথপুর গ্রামের আব্দুর রহমান বলেন, ‘দাম কম থাকায় জমি থেকেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। অনেক কষ্টে ফসল ফলালেও ন্যায্যমূল্য মেলে না, ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্যে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে চাই শুধু যে সরকারই আসুক, কৃষকের কষ্ট যেন লাঘব হয়।’
ক্ষেতলাল উপজেলার উত্তর হাটশহর গ্রামের বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘ভোট আসে, ভোট দিই, কিন্তু কৃষকের কষ্ট কমে না।’ কালাই হাটে সবজি বিক্রি করতে আসা কৃষকরাও একই হতাশার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার অন্তত ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেবে এবং সরকারি হিমাগার নির্মাণ করবে।
কালাই পৌর এলাকার কৃষক নিজাম উদ্দিন বলেন, ভোট এলেই প্রার্থীরা ভোটারদের খাওয়ানো-দাওয়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। ইউনিয়ন বা উপজেলা নির্বাচনে যেখানে প্রায় কোটি টাকা ব্যয় হয়, সেখানে সংসদ নির্বাচনে খরচ আরও বেশি। এতে সাধারণ মানুষের কাজের সময় কমে যায় এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষকরা।
সড়াইল গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, যে দলই সরকার গঠন করুক, যদি কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হয়, সেই দলকেই ভোট দেবেন। রাজনীতির প্রতি তাঁদের আগ্রহ নেই, আগ্রহ শুধু ন্যায্য দামে ফসল বিক্রি করার।
নিমেরপাড়া গ্রামের আমিরুল ইসলাম বলেন, দেশে বহু বছর পর সুষ্ঠু ভোট হচ্ছে। ভোটে যে দলই জিতুক, কৃষকদের চাওয়া সীমিত—তাদের ফসল যদি শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে কৃষক লাভবান হবেন। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দামও স্থিতিশীল থাকবে।
মাঠ ঘুরে দেখা যায়, ভোট নিয়ে কৃষকের প্রত্যাশা ও হতাশা ভিন্ন হলেও কথা একটাই—ভোট এলেও তাঁদের কষ্ট কমে না। তাই এবারের নির্বাচনে তাঁদের আশা, ক্ষমতায় আসা মানুষগুলো অন্তত কৃষকের দুঃখ-সন্তাপ বুঝবেন, মাঠে ফলানো ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করবেন। ঠিক তখনই হয়তো ভোটের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ভাগ্যও বদলাবে।
সিএ/এএ


