নির্বাচনী আচরণবিধিতে ধর্মীয় উপাসনালয়কে স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক প্রচারণার বাইরে রাখার নির্দেশনা থাকলেও সেই বিধান উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি মন্দিরের ভেতরে তাঁর উপস্থিতিতে উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী ফয়জুল হকের উপস্থিতিতে কাঁঠালিয়া উপজেলার আওরাবুনিয়া ইউনিয়নের একটি মন্দিরের ভেতর এই বৈঠক হয়। বৈঠকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের পাশাপাশি জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের স্থিরচিত্র ও ভিডিও প্রার্থী নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। গত বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাতে এসব ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এতে শুধু নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রশ্নই নয়, নির্বাচন কমিশনের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মন্দিরের ভেতরে প্রার্থনার স্থানে সারি সারি চেয়ার বসিয়ে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। অস্থায়ী মঞ্চের সামনে হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ভোটাররা বসে ছিলেন এবং তাঁদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দলীয় নেতাকর্মীরা। বৈঠকে ফয়জুল হক সরাসরি বক্তব্য দেন এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ভোট প্রত্যাশা করেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘মন্দির আমাদের উপাসনার জায়গা। সেখানে রাজনৈতিক বৈঠক হওয়াটা আমাদের জন্য অস্বস্তিকর। আমরা চাই না ধর্মীয় জায়গায় রাজনীতি ঢুকুক।’
নির্বাচন কমিশনের জারি করা জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণবিধিতে ধর্মীয় উপাসনালয়, ধর্মীয় স্থান বা ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নির্বাচনী সভা, সমাবেশ কিংবা ভোট প্রার্থনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নির্বাচনী আইনের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘উঠান বৈঠক’, ‘মতবিনিময়’ বা ‘সাধারণ সাক্ষাৎ’—যে নামেই ডাকা হোক, প্রার্থী উপস্থিত থেকে ভোট চাইলে তা সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, এটি কোনো গ্রে জোন নয়। মন্দিরের ভেতর তো নয়ই, এমনকি মন্দির প্রাঙ্গণেও নির্বাচনী বক্তব্য আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই বৈঠকের জন্য স্থানীয় প্রশাসন বা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো নথি পাওয়া যায়নি। কাঁঠালিয়া উপজেলা প্রশাসনও এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিতে পারেনি। বিধি অনুযায়ী, প্রার্থী কোথায় ও কখন উঠান বৈঠক করবেন, তা আগেভাগে লিখিতভাবে রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বিধান অনুযায়ী, ধর্মীয় স্থানে প্রচারণার সুযোগ নেই, ফলে অনুমতির বিষয়টি এখানে গৌণ হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রার্থীর ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট প্রার্থনার কর্মসূচি ছিল। সময়স্বল্পতার কথা বলে প্রার্থী মন্দিরে যান। তার আগেই দলীয় নেতাকর্মীরা আশপাশের নারী-পুরুষ ভোটারদের মন্দিরে জড়ো করেন।
ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে আলোচিত হলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সতর্কতা, শোকজ বা ব্যাখ্যা চাওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি। এর আগেও একই প্রার্থীর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁকে সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও তিনি পুলিশ প্রটোকলে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দুই পুলিশ সদস্যকে প্রচারণা থেকে বিরত রাখা হয়।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, এই ঘটনা উপেক্ষিত থাকলে ভবিষ্যতে অন্য প্রার্থীরাও ধর্মীয় স্থানকে প্রচারণার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করতে উৎসাহ পাবে। তিনি আরও বলেন, এর আগেও একই প্রার্থী পুলিশ প্রটেকশনে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন, সে সময়ও প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে ফয়জুল হকের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, এটি ‘সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ’ ছিল। তবে ধর্মীয় স্থানে প্রার্থীর উপস্থিতি ও ভোট প্রার্থনার ওপর আচরণবিধির নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ওই সূত্র কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
সিএ/এএ


