বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক উত্তরণ—এমন মত দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদদের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, এই উত্তরণের জন্য আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক নীতি ও মূল্যবোধে মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। একই সঙ্গে নতুন বন্দোবস্ত কার্যকর করতে কিছু নির্দিষ্ট সংস্কার প্রয়োজন এবং নির্বাচনের সময় গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপের এটিএম শামসুল হক মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংলাপে এসব মতামত তুলে ধরা হয়। ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক বিভাগীয় এই সংলাপের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর প্রতি জনগণের আগ্রহ তত বাড়ছে। জনগণ জানতে চায়, নির্বাচনে জয়ী হলে দলগুলো কী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে, কীভাবে করবে এবং কখন করবে। তিনি বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্ম আর অবিচার, বৈষম্য ও জবাবদিহিতাহীনতার উত্তরাধিকার বহন করতে চায় না। তারা অংশগ্রহণ, মর্যাদা এবং ন্যায়ভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে তিনি মবসন্ত্রাসের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সরকারের নীরবতা ও দুর্বলতার কারণে মব সংস্কৃতির অবসান ঘটছে না। তিনি সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য ও ভুল তথ্য রোধে ফ্যাক্ট চেকিং সেল গঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দলগুলো মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এ ছাড়া অনেক নারী প্রার্থী পুরুষদের কোটায় মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আর মাত্র ২৯ দিন বাকি থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য কতটা প্রস্তুত, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। চব্বিশের ৫ আগস্ট থানা থেকে লুট হওয়া এক হাজার ৩৬৫টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব অস্ত্র ভোটকেন্দ্রে ব্যবহৃত হবে না—এই নিশ্চয়তা কে দেবে।
জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, জামায়াতে ইসলামী সবসময় সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিনি জানান, দলটি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করছে এবং শিগগিরই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে আগামীর বাংলাদেশ কেমন দেখতে চায়, তার রূপরেখা তুলে ধরবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, নির্বাচনের আর মাত্র ২৯ দিন বাকি থাকলেও এখনো নির্বাচনের আমেজ তৈরি হয়নি। জনগণের মধ্যে এখনও এই প্রশ্ন রয়ে গেছে—নির্বাচন আদৌ হবে কি না। তিনি বলেন, অতীতে যারা পেশিশক্তি ও অর্থের ওপর নির্ভর করে নির্বাচন করেছেন, তারা এবারও একই পথে হাঁটছেন। যারা পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছেন, নতুন বাংলাদেশে তাদের পরিণতি ভালো হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, ভোটাররা নির্বাচন ও প্রার্থী সম্পর্কে যথাযথ তথ্য পাচ্ছেন না। যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশই অপতথ্য। এসব চিহ্নিত ও প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, অপতথ্য মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের উচিত একটি স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জসীম উদ্দিন খান ও অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন ও মুখপাত্র ফারুক হাসান, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নেয়ামূল বশির, বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা এবং সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য রাগিব আহসান মুন্না।
সিএ/এএ


