Wednesday, January 14, 2026
17 C
Dhaka

উদীচী কার্যালয়ে আগুনে পুড়ল ৫৭ বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক উপকরণ, নথিপত্র ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। রাজধানীর তোপখানা সড়কে উদীচী কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে সংগঠনটির ৫৭ বছরের সাংস্কৃতিক আন্দোলন, গণসংগীত ও প্রগতিশীল চর্চার ইতিহাস তুলে ধরা হয়।

প্রদর্শনীতে আগুনে পুড়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্র, নাটকের কস্টিউম, মঞ্চসজ্জার প্রপস, ব্যানার, পোস্টার, বই, আলোকচিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রাখা হয়। এসব উপকরণ দেখে অনেক দর্শনার্থী আবেগাপ্লুত ও বিমর্ষ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের সাক্ষ্য বহনকারী উপকরণগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে দেশের সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধির জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উদীচীর নেতারা অভিযোগ করেন, নৃশংস হামলা ও অগ্নিসংযোগের ২৪ দিন পার হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি সংগঠনটির খোঁজখবর নেননি। এমনকি ন্যূনতম সহানুভূতিও প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টিকে গভীর হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার।

লিখিত বক্তব্যে জামসেদ আনোয়ার বলেন, দেশের বৃহত্তম ও ঐতিহ্যবাহী গণভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর ওপর এমন ভয়াবহ হামলার পরও সংস্কৃতি উপদেষ্টার ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। তাঁর ভাষায়, এই নির্লিপ্ততা অনেক প্রশ্ন ও সংশয়ের জন্ম দিচ্ছে। সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার পক্ষে থাকা একটি সংগঠনের ওপর হামলার ঘটনায় সরকারের এমন অবস্থান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হামলাকে সুপরিকল্পিত উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, স্বাধীনতাবিরোধী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। উদীচী কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। সেই কার্যালয় ছাইয়ে পরিণত হওয়া দেশের সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধির ওপর সরাসরি আঘাত বলে মন্তব্য করেন নেতারা।

জামসেদ আনোয়ার আরও বলেন, গত বছর ১৮ ডিসেম্বর ছায়ানট, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। এর পরদিনই উদীচী কার্যালয়ে হামলা হয়। এই ধারাবাহিক ঘটনা প্রমাণ করে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত আক্রমণ। তিনি অভিযোগ করেন, প্রকাশ্য সমাবেশে ছাত্রশিবির নেতাদের হামলার হুমকির বিষয় সবার জানা থাকলেও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের নিস্পৃহতা এই বর্বরতার পথ সুগম করেছে।

হামলার দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল জানিয়ে জামসেদ আনোয়ার বলেন, পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, ‘আমরা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কার্যালয়ে অবস্থান করছিলাম। বিকেল ৪টার দিকে ছায়ানট ভবনের সামনে প্রতিবাদী কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পর ফেরার পথে উদীচীতে হামলার খবর পাই।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছর সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জন্য প্রদত্ত বার্ষিক সরকারি অনুদান থেকে পরিকল্পিতভাবে উদীচীকে বাদ দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে বৈষম্যমূলক ও অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। নেতারা বলেন, ভয় দেখিয়ে উদীচীকে দমন করা যাবে না।

সংবাদ সম্মেলন শেষে সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম পুড়ে যাওয়া কার্যালয় পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, এই দৃশ্য তাঁর মনে করিয়ে দিয়েছে ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বরের কথা, যখন পাকিস্তানি বাহিনী বেতিয়ারায় মানুষ হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দিয়েছিল।

এই আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, উদীচীর সহসভাপতি রফিকুল হাসান জিন্নাহ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি নিখিল দাসসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা। সংবাদ সম্মেলন শেষে উদীচীর সদস্যরা সম্মিলিত কণ্ঠে সংগঠনের সংগীত পরিবেশন করেন।

সিএ/এএ

spot_img

আরও পড়ুন

ইরানে বিক্ষোভ দমনে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা বাড়ছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে সরকারবিরোধী গণআন্দোলন দমনে...

এনসিপি ছাড়ার কারণ জানালেন তাসনিম জারা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা...

মৃত্যুদণ্ড হলে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করার ঘোষণা...

ট্রাম্পের হুমকির মুখেও ডেনমার্কের প্রতি নিলসেনের আনুগত্য

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মধ্যেও ডেনমার্কের...

রাজধানীতে আজ এক নজরে কর্মসূচির তালিকা

রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিনই বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, রাজনৈতিক দল ও...

ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন নীতি

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করেছে সরকার। এতদিন এই তালিকায়...

ঘন কুয়াশায় নৌপথে বাড়ছে সতর্কতার প্রয়োজন

ঘন কুয়াশার কারণে দেশের বিভিন্ন নদী অববাহিকায় দৃষ্টিসীমা উল্লেখযোগ্যভাবে...

পোস্টাল ভোটে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইসির উদ্যোগ

গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাপনা...

নির্বাচনে অপতথ্য রোধে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই যথেষ্ট...

এলপিজির আকাশছোঁয়া দামে নাকাল নগরবাসী

রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে আবারও তিতাস গ্যাসের বিতরণ...

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী...

গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে...

ইসলামে আত্মহত্যা ও আত্মপীড়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের দেহ,...

বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ানো নিপাহ ভাইরাসের সতর্কতা

বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক সংক্রামক রোগের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস...
spot_img

আরও পড়ুন

ইরানে বিক্ষোভ দমনে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা বাড়ছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে সরকারবিরোধী গণআন্দোলন দমনে যদি কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকর করতে শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তা কঠোরভাবে প্রতিহত করবে। মঙ্গলবার সিবিএস...

এনসিপি ছাড়ার কারণ জানালেন তাসনিম জারা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ডা. তাসনিম জারা। সাবেক এনসিপি নেত্রী এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন, যা...

মৃত্যুদণ্ড হলে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের দেশটির জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দখল...

ট্রাম্পের হুমকির মুখেও ডেনমার্কের প্রতি নিলসেনের আনুগত্য

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মধ্যেও ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী এবং গ্রিনল্যান্ডের শীর্ষ নেতা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ ডেনমার্ককেই বেছে নেবে।...
spot_img