Wednesday, January 14, 2026
17 C
Dhaka

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাইলে সহজেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আন্দোলনের অবসান ঘটাতে পারতেন। কিন্তু সে পথ না বেছে নিয়ে তিনি অবজ্ঞা ও দমননীতির আশ্রয় নেন। এর পরিণতিতে আন্দোলনটি ইতিহাসের নজিরবিহীন নৃশংসতার দিকে ধাবিত হয়—এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব মন্তব্য উঠে এসেছে। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত বছর ১৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন। ৫৭ দিন পর গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে ৪৫৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কীভাবে দমন-পীড়ন ও হত্যার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে।

রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং আরেকটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেশে থাকা তাঁদের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া মামলার সাক্ষী থেকে রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকরের নির্দেশও উল্লেখ করা হয়।

পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পন্থায় মীমাংসায় পৌঁছানোর যথেষ্ট সুযোগ ছিল। যে কোটা ব্যবস্থা শেখ হাসিনা আগেই একবার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেছিলেন, সেটি একই ইস্যুতে আবার কেন পুনরুজ্জীবিত হলো—এই প্রশ্নও তোলা হয়েছে রায়ে।

রায়ে আরও বলা হয়, আন্দোলনের সময় বৃদ্ধ, শিশু ও নারীদের ওপর যে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছে, তা বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল কক্ষে প্রদর্শিত ভিডিওতে হতাহত আন্দোলনকারীদের আর্তনাদ এবং মাথার খুলি, চোখ, নাক, হাত-পা হারানো ভুক্তভোগী সাক্ষীদের দৃশ্য দেখে কোনো মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ট্রাইব্যুনালের মতে, এ ধরনের নৃশংসতা যে কোনো মূল্যে চিরতরে বন্ধ করা প্রয়োজন এবং ন্যায়বিচারকে ব্যর্থ হতে দেওয়া উচিত নয়।

রায়ে সুনির্দিষ্ট দুটি অভিযোগের আওতায় মোট ছয়টি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে তিনটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে শেখ হাসিনার দেওয়া সুপরিকল্পিত উস্কানিমূলক বক্তব্য। একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের ‘ফাঁসি দেওয়ার’ সরাসরি উস্কানি ও নির্দেশের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত। রায়ে বলা হয়েছে, অধস্তনদের এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আসামিরা কোনো ধরনের বাধা দেননি। এসব নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। এই অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগেও তিনটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। এতে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপের তথ্য উঠে এসেছে। রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব কথোপকথনে ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং হেলিকপ্টার ও মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে হত্যার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

এই নির্দেশনার ফল হিসেবে ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয়জন আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। একই দিনে সাভারের আশুলিয়ায় আরও ছয়জনকে হত্যার পর তাঁদের মরদেহে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে। এসব অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল একটি নজিরবিহীন নির্দেশনাও দিয়েছেন। দণ্ডিত ব্যক্তিদের নামে দেশে থাকা সব স্থাবর সম্পত্তি যেমন জমি ও বাড়ি এবং অস্থাবর সম্পত্তি যেমন ব্যাংক ব্যালেন্স ও শেয়ার রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা অর্থ ও সম্পদ যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ে সরকারকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মাধ্যমে জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছাল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ৪৫৭ পৃষ্ঠার এই রায় ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নিরীহ জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এবং মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধের বিচারিক দলিল হিসেবে এটি দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকবে।

সিএ/এএ

spot_img

আরও পড়ুন

ইরানে বিক্ষোভ দমনে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা বাড়ছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে সরকারবিরোধী গণআন্দোলন দমনে...

এনসিপি ছাড়ার কারণ জানালেন তাসনিম জারা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা...

মৃত্যুদণ্ড হলে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করার ঘোষণা...

ট্রাম্পের হুমকির মুখেও ডেনমার্কের প্রতি নিলসেনের আনুগত্য

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মধ্যেও ডেনমার্কের...

রাজধানীতে আজ এক নজরে কর্মসূচির তালিকা

রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিনই বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, রাজনৈতিক দল ও...

ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন নীতি

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করেছে সরকার। এতদিন এই তালিকায়...

ঘন কুয়াশায় নৌপথে বাড়ছে সতর্কতার প্রয়োজন

ঘন কুয়াশার কারণে দেশের বিভিন্ন নদী অববাহিকায় দৃষ্টিসীমা উল্লেখযোগ্যভাবে...

পোস্টাল ভোটে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইসির উদ্যোগ

গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাপনা...

নির্বাচনে অপতথ্য রোধে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই যথেষ্ট...

এলপিজির আকাশছোঁয়া দামে নাকাল নগরবাসী

রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে আবারও তিতাস গ্যাসের বিতরণ...

উদীচী কার্যালয়ে আগুনে পুড়ল ৫৭ বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক...

গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে...

ইসলামে আত্মহত্যা ও আত্মপীড়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের দেহ,...

বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ানো নিপাহ ভাইরাসের সতর্কতা

বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক সংক্রামক রোগের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস...
spot_img

আরও পড়ুন

ইরানে বিক্ষোভ দমনে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা বাড়ছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে সরকারবিরোধী গণআন্দোলন দমনে যদি কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকর করতে শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তা কঠোরভাবে প্রতিহত করবে। মঙ্গলবার সিবিএস...

এনসিপি ছাড়ার কারণ জানালেন তাসনিম জারা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ডা. তাসনিম জারা। সাবেক এনসিপি নেত্রী এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন, যা...

মৃত্যুদণ্ড হলে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের দেশটির জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দখল...

ট্রাম্পের হুমকির মুখেও ডেনমার্কের প্রতি নিলসেনের আনুগত্য

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মধ্যেও ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী এবং গ্রিনল্যান্ডের শীর্ষ নেতা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ ডেনমার্ককেই বেছে নেবে।...
spot_img