ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে ধীরে ধীরে বাড়ছে নির্বাচনী তৎপরতা। দলীয় মনোনয়ন ঘিরে বিভাজন, সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের কৌশল এবং নেতাকর্মীদের দলবদল—সব মিলিয়ে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
স্বাধীনতার পর ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ছাড়া গোপালগঞ্জের তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে দলটির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলায় অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি প্রকাশ্যে নেই। ফলে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট টানতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। আবার অনেক ভোটার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার কথাও জানাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৯ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত নিষিদ্ধ দলটির ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের ৪৬ জন নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ নেতাকর্মী আওয়ামী লীগ ছাড়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার তারাইল গ্রামের ভোটার কল্যাণ কীর্ত্তনীয়া (৬০) বলেন, ‘ভোটে নৌকা নাই, ভাবতি কষ্ট হচ্ছে। ব্যক্তি অপরাধ করতি পারে, সেই জুন্নু দল থাকপে না, তা কি হয়? নির্বাচনে ভোট দিতি যাব কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে রইছি।’
নাসিরউদ্দিন মিয়া (৬৫) বলেন, ‘ভোটের মাঠে তেমন কোনো উত্তাপ দেখতিছিনে। কেউ এহনো ভোট চায় নাই। কী করব বুঝে উঠতি পরিতিছিনে।’
ডুমরিয়া গ্রামের প্রান্ত বালা (২৫) বলেন, ‘যে প্রার্থী আমাগে শিক্ষা বিস্তার ও বেকারত্ব নিরসনে কাজ করবেনে, তাঁকেই ভোট দেবানি।’
হারান বালা (৭০) বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেই তাতে কী হইছে? ভোট তো আছে, ভোট অবশ্যই দিতি হবেনে।’
ছোট ডুমরিয়া গ্রামের অনিমেষ রায় (৩৫) বলেন, ‘যে চাঁদাবাজ, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে পারবে ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতি পারবে, তাকেই আমরা ভোট দেব।’
গোপালগঞ্জ-১
গোপালগঞ্জ সদর ও কাশিয়ানী উপজেলার সাত ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. সেলিমুজ্জামান মোল্লা। কাশিয়ানীর মাঝিগাতী গ্রামের বাসিন্দা সেলিমুজ্জামান মোল্লা ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির শূরা সদস্য ও জেলার সাবেক আমির মোহাম্মাদ আবদুল হামিদ। এর আগেও তিনি এই আসন থেকে জামায়াতের পক্ষে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
সেলিমুজ্জামান মোল্লা বলেন, ‘ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা আচরণবিধি মেনে এলাকায় কাজ করে যাচ্ছি।’
মোহাম্মাদ আবদুল হামিদ বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় আমাদের কর্মীদের বিভিন্ন প্রার্থী ও তাঁর পক্ষের লোকজন হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। এটা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে নির্বাচনের পরিবেশ ভালো থাকবে না।’
এই আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন এম আনিসুল ইসলাম (স্বতন্ত্র), জাতীয় পার্টির সুলতান জামান খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মিজানুর রহমান, জনতার দলের জাকির হোসেন, কমিউনিস্ট পার্টির নীরদ বরণ মজুমদার, এবি পার্টির প্রিন্স আল আমিন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ইমরান হুসাইন আফসারী।
গোপালগঞ্জ-২
সদর ও কাশিয়ানী উপজেলার সাত ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ডা. কে এম বাবর। তিনি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ সংসদে ছাত্রদলের ভিপি ছিলেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এইচ খান মঞ্জু জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তিনি ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে গোপালগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামী কোনো প্রার্থী না দিয়ে শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শুয়াইব ইব্রাহিমকে সমর্থন দিচ্ছে। স্থানীয় ভোটারদের মতে, এই আসনে ডা. কে এম বাবর, এম এইচ খান মঞ্জু ও কামরুজ্জামন ভূঁইয়ার মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন গণফোরামের শাহ মফিজ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তসলিম হোসাইন সিকদার, জাকের পার্টির মাহামুদ হাসান ও গণঅধিকার পরিষদের দ্বীন মোহাম্মদ।
গোপালগঞ্জ-৩
টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষক ও মৎস্যজীবী। স্থানীয়দের ধারণা, এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল লড়াই হবে।
বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এস এম জিলানী। তাঁর গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতী গ্রামে। ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। ছাত্রদল থেকে রাজনীতি শুরু করা জিলানী বিএনপির দুঃসময়েও এলাকায় সক্রিয় ছিলেন। ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি এলাকায় আরও তৎপর হয়েছেন এবং তপশিল ঘোষণার আগেই প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন। ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে বিভিন্ন কৌশল নিচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, টুঙ্গিপাড়ায় গত ১০ জানুয়ারি দুজন, ৮ জানুয়ারি দুজন, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর তিনজন, ২০ ডিসেম্বর ১৩ জন এবং ২৩ ডিসেম্বর ২৬ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এস এম জিলানীর হাত ধরে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
এস এম জিলানী বলেন, ‘আমি চাই, প্রতিটি ভোটার যেন ভয়ভীতি বা বাধা ছাড়াই কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাই– বিনা বাধায়, শতভাগ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আপনারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করুন।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা আমির এম এম রেজাউল করিম এক বছরের বেশি সময় ধরে এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘প্রচার-প্রচারণায় সাড়া পাচ্ছি। ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবেন বলে আমাকে আশ্বস্ত করছেন। আমি মনে করি, নির্বাচন উৎসবমুখর হবে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী মো. আরিফুল দাড়িয়া বলেন, ‘টুঙ্গিপাড়া-কোটালীপাড়া আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক– এটি অস্বীকার করার কিছু নেই। আওয়ামী লীগ ভোটে নেই। এর প্রভাব কিছুটা হলেও পড়তে পারে। প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে ভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ জানা যাবে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিত করতে আমাদের সব চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’
এই আসনের অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন গণঅধিকার পরিষদের আবুল বাশার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মারুফ শেখ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শেখ সালাউদ্দিন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আ. আজিজ, গণফোরামের দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, খেলাফত মজলিসের আলী আহমেদ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুর রহমান।
সিএ/এএ


