বরিশাল সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৫ সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেওয়া হবে কিনা—এ প্রশ্নকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইসলামী দলগুলোর জোটগত সমঝোতা, অতীত নির্বাচনী অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে আসনটি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি জোট সংশ্লিষ্ট দলগুলো।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর দলীয় তৎপরতা এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির গঠনে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে বরিশাল-৫ আসনে কে চূড়ান্ত প্রার্থী হবেন—তা নিয়ে ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম নিজ নিজ দলের মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। সম্প্রতি মোয়াযযম হোসাইন হেলালকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই কমিটির অন্য কোনো সদস্য এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হননি। এতে করে বরিশাল-৫ আসনে জামায়াত সরাসরি প্রার্থী দেবে কিনা—এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির ছাড়া আর কেউ একাধিক আসনে মনোনয়ন দাখিল করেননি। সুতরাং একটি আসন ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বরিশাল-৫ আসনটি জোট বিবেচনায় জামায়াতের দাবির মধ্যেই থাকব।’
মোয়াযযম হোসাইন হেলাল জানান, ‘জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’ তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, বরিশাল-৫ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়টি এককভাবে জামায়াতের সিদ্ধান্ত নয়; বরং পুরোপুরি জোটগত সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অবস্থান জামায়াতের সিদ্ধান্তকে আরও জটিল করে তুলেছে। দলটির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম প্রকাশ্যে এই আসনকে তাঁদের ‘আমিরের আসন’ বলে দাবি করেছেন। পাশাপাশি তিনি এই আসনের সঙ্গে আরও একটি আসনে মনোনয়ন দাখিল করেছেন, যা জোট আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের ভেতরেই আলোচনা চলছে—জোটের বৃহত্তর স্বার্থে বরিশাল-৫ আসনে সরাসরি প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করা বাস্তবসম্মত হবে কিনা। তবে এ বিষয়ে এখনো দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি।
তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, বরিশাল সদর আসনটি ইসলামী আন্দোলনকে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটের মেয়র প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের মোয়াযযম হোসাইন হেলালকে দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা চলছে।
নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে লাঙ্গল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ফয়জুল করিম। তিনি ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে হাতপাখা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফয়জুল করিম এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামানত হারান। হাতপাখা প্রতীকে তিনি পেয়েছিলেন ২৭ হাজার ৬২ ভোট। পরে ২০২৩ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ৩৩ হাজার ৮২৮ ভোট পান। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ৮৭ হাজার ৮০৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
অন্যদিকে, বরিশাল সদর আসনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইতিহাস শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয় না। ১৯৯১ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে জামায়াতের বরিশাল জেলা আমির আবুল হাসানাত মো. নুরুল্লাহ অংশ নিয়ে পেয়েছিলেন পাঁচ হাজার ৭০৪ ভোট। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী মোয়াযযম হোসাইন হেলালের প্রাপ্ত ভোট ছিল চার হাজার ৬৬৭। এরপর আর কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জামায়াত সরাসরি প্রার্থী দেয়নি।
সিএ/এএ


