সুন্দরবনে পর্যটক অপহরণের মূল হোতা মাসুম মৃধা (২৩) কে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে কোস্টগার্ড। বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতে সুন্দরবন সংলগ্ন ধানখালী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কোস্টগার্ড জানায়, গ্রেপ্তার মাসুম মৃধার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সুন্দরবনের গাজী ফিশারিজ সংলগ্ন এলাকায় তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে তিনটি দেশীয় ওয়ান শুটার পাইপগান, আট রাউন্ড তাজা কার্তুজ, চার রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, একটি চাইনিজ কুড়াল, দুটি দেশীয় কুড়াল, একটি দা, একটি স্টিল পাইপ এবং মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এছাড়াও অপহৃত পর্যটকদের ব্যবহৃত পাঁচটি মোবাইল ফোন ও একটি হাতঘড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ডাকাত ও জব্দ করা আলামতের বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আবরার হাসান বলেন, ‘সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে সুন্দরবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এছাড়াও জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে কয়েকটি ডাকাত দল বনজ সম্পদ লুণ্ঠন, জেলে ও বনজীবীদের অপহরণসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কার্যক্রম করে আসছে। ডাকাত চক্র সমুহের কর্মকাণ্ডে পর্যটন শিল্প, বাস্তুসংস্থান এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কোস্ট গার্ড তার দায়িত্বের অংশ হিসেবে সূচনালগ্ন থেকে ডাকাতের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করে আসছে।’
কোস্টগার্ড সূত্রে জানা যায়, গত ২ জানুয়ারি সুন্দরবনের গোলকানন রিসোর্ট থেকে কানুরখাল সংলগ্ন এলাকায় কাঠের বোটে ভ্রমণের সময় মাসুম বাহিনী দুইজন পর্যটকসহ গোলকানন রিসোর্টের মালিককে জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। বিষয়টি জানার পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ কোস্টগার্ডকে অবগত করে।
এরপর গোয়েন্দা তথ্য, ড্রোন নজরদারি এবং ফিনান্সিয়াল ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে টানা ৪৮ ঘণ্টা যৌথ অভিযান পরিচালনা করে কোস্টগার্ড। অভিযানের এক পর্যায়ে জিম্মি থাকা পর্যটক ও রিসোর্ট মালিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
এ সময় ডাকাত চক্রের সদস্য কুদ্দুস হাওলাদার (৪৩), মো. সালাম বক্স (২৪), মেহেদী হাসান (১৯), আলম মাতব্বর (৩৮), অয়ন কুন্ডু (৩০), মো. ইফাজ ফকির (২৫), জয়নবী বিবি (৫৫) এবং মোছা দৃধা (৫৫)-কে সুন্দরবন, দাকোপ ও খুলনার বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করে দাকোপ থানায় হস্তান্তর করা হয়।
কোস্টগার্ড জানায়, গত এক বছরে সুন্দরবনে ডাকাত ও জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, দুটি হাতবোমা, ৭৪টি দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জাম, ৪৪৮ রাউন্ড কার্তুজ এবং জিম্মি থাকা ৫২ জন নারী ও পুরুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অভিযানে মোট ৪৯ জন সক্রিয় ডাকাতকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কোস্টগার্ডের ধারাবাহিক অভিযানে আছাবুর বাহিনী, হান্নান বাহিনী, আনারুল বাহিনী, মঞ্জু বাহিনী এবং রাঙ্গা বাহিনী সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ একাধিক সহযোগী আটক হওয়ায় ছোট সুমন বাহিনী, ছোটন বাহিনী ও কাজল মুন্না বাহিনী ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সক্রিয় করিম শরিফ বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী ও দয়াল বাহিনীকে দমনে কোস্টগার্ড টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করেছে।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আবরার হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, জেলে ও বনজীবীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে ভবিষ্যতেও নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখবে।’
সিএ/এএ


