সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার কেন্দ্রীয় ফায়ার স্টেশনের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি আরও বড় সংকট হলো নদীঘেরা এই উপজেলা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ জলসীমার জন্য কোনো নৌ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকা। সড়কপথে সিলেট সদর থেকে জকিগঞ্জ উপজেলার দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার, কানাইঘাটের দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার এবং বিয়ানীবাজারের দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। এই তিন উপজেলাসহ মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় কোনো অগ্নিকাণ্ড বা নৌ দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো কোনো নদী ফায়ার স্টেশন নেই।
দুই জেলার সীমান্তবর্তী মোট আটটি উপজেলায় নদী ফায়ার স্টেশন না থাকায় বছরের পর বছর ধরে তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ এই সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। একই সঙ্গে নদীপথে চলাচলকারী জলযান ব্যবসায়ী ও যাত্রীদেরও প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
সিলেট জেলার সুরমা, কুশিয়ারা ও সোনাই নদীর তীরবর্তী জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, জৈন্তা, বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ—এই পাঁচ উপজেলার সঙ্গে মৌলভীবাজার জেলার সোনাই নদীর তীরবর্তী বড়লেখা এবং মনু নদীবিধৌত জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তাঞ্চলে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, শিল্পায়ন, চা-বাগান, গ্যাসক্ষেত্র ও বিদ্যুৎ গ্রিড স্টেশন রয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও নদী ফায়ার স্টেশন না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমে উঠেছে।
বিয়ানীবাজার উপজেলা কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর মধ্যবর্তী অবস্থানে হলেও এখানে কোনো নদী ফায়ার স্টেশন নেই। ২৫৮ বর্গকিলোমিটারের এই উপজেলায় বর্তমানে সি গ্রেডভুক্ত একটি ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশন রয়েছে। বিশাল এলাকার দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম সামলাতে গিয়ে এই স্টেশনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় চারখাই এলাকায় আরেকটি ফায়ার স্টেশন স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অনুরোধ জানানো হলেও আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী তিনটি নদী থাকা সত্ত্বেও নদী ফায়ার স্টেশন স্থাপনের বিষয়টি এখনো আলোচনায় আসেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগের কথা শোনা যায়নি। সচেতন মহলের মতে, কুশিয়ারা বা সুরমা নদীর বিয়ানীবাজার অংশে একটি নদী ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা হলে আশপাশের অন্তত চারটি উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সরাসরি সেবা পেতে পারে।
নৌ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালানো গেলে অনেক প্রাণ রক্ষা সম্ভব হতো। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কুশিয়ারা নদীর বিয়ানীবাজারের আঙ্গুরা মোহাম্মদপুর এলাকায় গোসল করতে নেমে এক শিক্ষার্থী নদীতে তলিয়ে যায়। সিলেট থেকে ডুবুরি এসে প্রায় তিন ঘণ্টা পর নদীর গভীর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই ধরনের ঘটনা গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় ঘটে, যেখানে এক ব্যবসায়ী নদীতে তলিয়ে গেলে পরদিন ডুবুরি এসে মরদেহ উদ্ধার করেন।
বিয়ানীবাজার ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশন সূত্রে জানা যায়, কুশিয়ারা নদীভাঙনের কারণে কুড়ারবাজার, শেওলা ও দুবাগ ইউনিয়নের অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এসব এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে পারে না। এছাড়া পাম্প বহরের জন্য ছোট যানবাহন না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলায় দমকল কর্মীদের চরম বেগ পেতে হচ্ছে।
বিয়ানীবাজার ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা সুকুমার সিংহ বলেন, ‘বেশ কিছু এলাকার রাস্তা ছোট। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রকল্পের কাজের সময় সড়ক ব্যবস্থার সব দিক ভাবতে হবে। পানির রিজার্ভ ট্যাঙ্ক বহনকারী ছোট গাড়ি ও পাম্প দরকার। গ্রেড উন্নত করা সময়ের দাবি।’ তিনি জানান, গত জানুয়ারিতে মাথিউরা এলাকার রায়বাসি ও শেওলা ইউনিয়নের কোনশালেশ্বর এলাকায় অগ্নিদুর্ঘটনার সময় রাস্তার কারণে গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সিলেটের সহকারী পরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘নদী ফায়ার স্টেশন থাকলে নৌদুর্ঘটনাসহ নৌপথের নিরাপত্তা এবং তীরবর্তী অঞ্চলের অগ্নিদুর্ঘটনাসহ যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।’ তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রকল্পের মাধ্যমে নদী ফায়ার স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সিএ/এএ


