চুয়াডাঙ্গা জেলায় জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় নতুন নীতি গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। ‘নো ফুয়েল কার্ড, নো পেট্রল-অকটেন’ নীতির আওতায় এখন থেকে ফুয়েল কার্ড দেখিয়ে পেট্রলপাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করতে হবে মোটরসাইকেলমালিক ও চালকদের। আগামী বুধবার ( ১ এপ্রিল) থেকে এই ব্যবস্থা কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
রোববার ( ২৯ মার্চ) দুপুরে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জ্বালানি তেলের মজুত, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবহার নিয়ে আয়োজিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে প্রশাসনের কর্মকর্তা, পেট্রলপাম্প মালিক, রাজনৈতিক নেতা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জেলা প্রশাসক জানান, জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে মোটরসাইকেলমালিক ও চালকদের জন্য ফুয়েল কার্ড চালু করা হচ্ছে। কার্ড পেতে জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধনের এক সেট ফটোকপি এবং একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি জমা দিতে হবে। এসব কাগজপত্র জমা দিলে বিনা মূল্যে ফুয়েল কার্ড দেওয়া হবে। আগামী সোমবার ( ৩০ মার্চ) ও মঙ্গলবার ( ৩১ মার্চ) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কাগজপত্র জমা দিয়ে কার্ড সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।
নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় পেট্রলপাম্পে তেল সরবরাহের সময় সংশ্লিষ্ট কার্ডধারী আগে কখন এবং কত পরিমাণ তেল নিয়েছেন তা যাচাই করা হবে। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত মজুত বা অপচয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
সভায় জানানো হয়, জেলার ২২টি পেট্রলপাম্প প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মজুত থাকা সাপেক্ষে পেট্রল ও অকটেন বিক্রি করবে। তবে রাত আটটার পর শুধুমাত্র ডিজেল সরবরাহের জন্য পাম্প খোলা রাখা হবে, যাতে কৃষিকাজে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে। পাম্পে কর্মরত শ্রমিকদের মাধ্যমে যেন কোনো অনিয়ম না ঘটে, সে বিষয়ে পাম্পমালিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
তিনি আরও বলেন, কোনো গাড়ির মালিক বা চালক বোতল বা কনটেইনারে করে তেল নিতে পারবেন না। যাঁদের তেলের প্রয়োজন, তাঁদের নিজ নিজ যানবাহন নিয়ে পাম্পে এসে প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সংগ্রহ করতে হবে।
সভায় স্থানীয় পেট্রলপাম্প মালিকদের পক্ষ থেকেও নানা অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। চুয়াডাঙ্গার মামুন ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মামুন অর রশিদ বলেন, অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করা হয়, ফলে সাধারণ মানুষের গাড়ি খালি ফিরিয়ে দিতে হয়। তিনি জানান, ৯ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি গাড়িতে অনেক সময় ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার লিটার তেল দেওয়া হয়। তাঁর মতে, তেল সংকটের আশঙ্কায় অনেকেই মজুত করার চেষ্টা করছেন। ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হলে জেলায় সংকট তৈরি হবে না।
চুয়াডাঙ্গা জেলা জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তসলিম আরিফ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তিন বছরের গড় সরবরাহের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম তেল বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। আগে ডিপো থেকে পেট্রলপাম্প মালিক, এজেন্সি পয়েন্ট ও প্যাক পয়েন্ট—এই তিন ধরনের ব্যবসায়ীকে তেল সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে এজেন্সি ও প্যাক পয়েন্টে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ শহরে এসে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে কৃষকেরাও ডিজেল সংগ্রহ করতে শহরে ভিড় করছেন।
সভায় চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান বলেন, ‘খোলাবাজারে তেল বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ। পাম্পের মালিক, কর্মচারী বা অন্য কোনো নাগরিক—কেউই এ ধরনের কাজ করলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। কালোবাজারি ও মজুতদারিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় আনা হবে। ৩০ মার্চ থেকে অবৈধ মোটরসাইকেল আটক অভিযান শুরু হবে। কাগজপত্র না থাকলে কেউ যেন গাড়ি বের না করেন।’
বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যাতে জ্বালানি তেল চোরাচালানের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার না হয়, সে বিষয়ে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। জেলা প্রশাসনের মনিটরিং কমিটিকে তথ্য দিয়ে সবাই সহযোগিতা করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সভায় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, কৃষি খাতে যাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীরা জরুরি প্রয়োজনে যাতে সহজে তেল সংগ্রহ করতে পারেন, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সিএ/এমই


