কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে থাকা ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জন্য আগামী ১ এপ্রিল থেকে মাসিক খাদ্যসহায়তার নতুন কাঠামো চালু করা হচ্ছে। এতদিন জনপ্রতি ১২ ডলার করে সহায়তা দেওয়া হলেও নতুন ব্যবস্থায় পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলারে ভাগ করে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে নেওয়া এ সিদ্ধান্তে শিবিরজুড়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গারা বলছেন, বর্তমান সহায়তায়ই মাস চালানো কঠিন, সহায়তা কমানো হলে খাদ্যসংকট, অপুষ্টি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
কক্সবাজারের টেকনাফের জাদিমুরা আশ্রয়শিবিরের একটি ছোট ঘরে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে প্রায় আট বছর ধরে বসবাস করছেন রোহিঙ্গা ছৈয়দ করিম। তাঁর বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের উত্তরের বলিবাজার গ্রামে। আশ্রয়শিবিরে শরণার্থী হিসেবে স্বামী-স্ত্রী দুজনই মাসে ১২ ডলার করে মোট ২৪ ডলার খাদ্যসহায়তা পান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৯৩৫ টাকার সমান। এই অর্থে সাত সদস্যের সংসার চালানো কঠিন বলে জানান তিনি। আগামী এপ্রিল থেকে জনপ্রতি সহায়তা সাত ডলারে নেমে আসতে পারে—এমন খবর শুনে তিনি আরও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
ছৈয়দ করিম বলেন, সামনে দুঃখকষ্ট আরও বাড়বে। আগে বাড়তি আয়ের জন্য শিবিরের বাইরে মজুরির কাজ করে দিনে ২০০-৩০০ টাকা আয় করতেন। এখন কড়াকড়ির কারণে সে সুযোগও নেই। বিশেষ করে চারজনের বেশি সদস্যের পরিবারগুলোর খাবার জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জাদিমুরা আশ্রয়শিবিরে প্রায় ৩৭ হাজার রোহিঙ্গার বসবাস। তাদের বেশির ভাগই ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। শিবিরের বাসিন্দা আবদুল নবী বলেন, ‘আট বছর ধরে আমরা আশ্রয়শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। তহবিলসংকটের কথা বলে খাদ্যসহায়তা কমানো হচ্ছে। ফিরে যাওয়ার বিষয়েও কোনো অগ্রগতি নেই।’
পাশের লেদা আশ্রয়শিবিরেও খাদ্যসহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। বিভিন্ন চায়ের দোকান, হাটবাজার ও আড্ডাস্থলে রোহিঙ্গারা সহায়তা বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করছেন। অনেকের আশঙ্কা, সহায়তা কমলে শিবিরে অপরাধ, অপুষ্টি ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
লেদা আশ্রয়শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আলম বলেন, মানবিক কারণে বাংলাদেশ ১৪ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে—এর জন্য তাঁরা কৃতজ্ঞ। তবে সম্প্রতি জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, আগামী ১ এপ্রিল থেকে মাসিক সহায়তা কমানো হবে। পরিবারের অবস্থা অনুযায়ী কেউ ১২, কেউ ১০, আবার কেউ ৭ ডলার পাবেন। এতে শিবিরে অসন্তোষ বাড়ছে। মাঝিরা দফায় দফায় বৈঠক করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না।
রোহিঙ্গা নেতা আবুল মনছুর বলেন, ১২ ডলারেই একটি পরিবারের ১৫ দিন চলে না। অনেক পরিবার খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। অর্থসংকটে এবারের ঈদও ঠিকমতো উদ্যাপন করা যায়নি। পানি, জ্বালানি ও নিরাপত্তার সংকট রয়েছে। এমন অবস্থায় সহায়তা কমালে বিপর্যয় নেমে আসবে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের সহিংসতার পর কয়েক মাসে এসেছে প্রায় আট লাখ মানুষ। গত আট বছরে এখনো একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বরং গত দেড় বছরে নতুন করে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্নভাবে আশ্রয়শিবিরে ঢুকেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যসহায়তা কমানো হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে শিশুদের ওপর। এতে অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, গতকাল রোববার পর্যন্ত সব পরিবারকে ১২ ডলার করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে ১ এপ্রিল থেকে পরিবারগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি জানান, নতুন ব্যবস্থায় পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলার করে সহায়তা দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। ভবিষ্যতে তহবিল বাড়লে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগও রয়েছে।
আরআরআরসি কার্যালয় ও আশ্রয়শিবির সূত্রে জানা গেছে, যেসব পরিবারে আয় করার মতো সদস্য রয়েছে এবং নির্ভরশীল কম, তাদের ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রেখে সাত ডলার দেওয়া হবে। এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১৭ শতাংশ। নারী, শিশু ও নির্ভরশীল সদস্য বেশি—এমন পরিবারকে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে রেখে ১২ ডলার দেওয়া হবে, যা প্রায় ৩৩ শতাংশ পরিবার। অন্যদিকে মাঝামাঝি অবস্থার প্রায় ৫০ শতাংশ পরিবার ‘বি’ ক্যাটাগরিতে পড়ে, তারা পাবে ১০ ডলার করে।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তহবিল কমে যাওয়ার বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা নেতারা আশঙ্কা করছেন, সহায়তা কমানো হলে আশ্রয়শিবিরে মানবিক সংকট আরও তীব্র হতে পারে। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আগে ১৪ ডলার থেকে কমিয়ে ৮ ডলার করা হয়েছিল, পরে ১২ ডলারে আনা হয়। এখন আবার সাত ডলারে নামানো হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।
সিএ/এমই


