মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর প্রায় এক বছর ধরে অচল হয়ে রয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এই বন্দর দিয়ে বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। এতে দেড় শতাধিক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার পণ্য মিয়ানমারে আটকে আছে। একই সঙ্গে সরকার প্রতি মাসে প্রায় ১২০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
বন্দরকেন্দ্রিক প্রায় ৪০০ আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকা সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন বাণিজ্য বন্ধ থাকায় বন্দরের কার্যক্রমও প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থলবন্দরটি প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। বন্দরে নেই পণ্যবোঝাই ট্রাক, নেই শ্রমিকদের ব্যস্ততা। নাফ নদীর তীরের জেটিতেও দেখা যায় না কোনো ট্রলার বা জাহাজ। বন্দরের আশপাশের দোকানপাটের বেশির ভাগই বন্ধ রয়েছে।
একসময় কাঠের ট্রলার ও ছোট জাহাজে করে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে কাঠ, হিমায়িত মাছ, পেঁয়াজ, আদা, মরিচ ও সুপারি সহ নানা পণ্য আসত টেকনাফ স্থলবন্দরে। বন্দরের জেটিতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি পণ্যবোঝাই জাহাজ ভিড়ত। সেখান থেকে শত শত ট্রাকে করে এসব পণ্য পাঠানো হতো চট্টগ্রাম, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত পুরো বন্দর এলাকা।
বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে পণ্যবোঝাই ট্রলার বা জাহাজ নাফ নদীতে প্রবেশ করলে আরাকান আর্মির গুলি চালানো বা জাহাজ আটক করার ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে গত বছরের ৩ মার্চ থেকে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বাণিজ্য চালু হয়নি।
বন্দর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ গুদাম তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। কিছু শ্রমিক ঘোরাফেরা করলেও তাঁদের হাতে কোনো কাজ নেই।
শ্রমিক নুর কামাল বলেন, ‘আগে প্রতিদিন মাল খালাস করে প্রায় ৭০০ টাকা আয় হতো। সেই আয়েই পাঁচ সদস্যের সংসার চলত। এক বছর ধরে কাজ না থাকায় দুই ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে।’
শ্রমিকদের দলপতি শামসুল আলম জানান, আগে বন্দরে দুই হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে তাঁদের প্রায় ৯৫ শতাংশই বেকার হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ এখনো আরাকান আর্মির হাতে থাকায় বাণিজ্য কবে আবার শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
টেকনাফ স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এহতেশামুল হক বাহাদুর বলেন, দীর্ঘদিন বাণিজ্য বন্ধ থাকায় প্রায় ১৫০ ব্যবসায়ী মারাত্মক সংকটে পড়েছেন। তাঁদের প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার পণ্য মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন ও সিত্তে বন্দরে আটকে রয়েছে।
সমিতির সহসভাপতি মো. ওমর ফারুক বলেন, আটকে থাকা পণ্যের মধ্যে কাঠ, সুপারি, বরই, তেঁতুল, হিমায়িত মাছ ও শুঁটকি রয়েছে। দীর্ঘদিন গুদামে পড়ে থাকার কারণে শত কোটি টাকার পেঁয়াজ ও আদা ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩ মার্চ মিয়ানমার থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে ৬৭৫ দশমিক ৪৩ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। এতে সরকার প্রায় ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ৩ হাজার ৪৫৫ মেট্রিক টন আলু, বিস্কুট, পানীয় ও প্লাস্টিক পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করা হয়েছিল।
শুল্ক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সরকার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এক বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
স্থলবন্দর পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেড টেকনাফের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এক বছর ধরে বাণিজ্য বন্ধ থাকায় বন্দর কর্তৃপক্ষেরও প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বন্দর কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সীমান্তে চোরাচালান থেমে নেই। সীমান্ত সূত্রে জানা যায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার অন্তত ৩৩টি স্থান দিয়ে নিয়মিত পণ্য পাচার হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সার, জ্বালানি তেল, সিমেন্টসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। বিপরীতে মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা, আইস ও অস্ত্রের চালান। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেল পাচারের ঘটনাও বেড়েছে বলে জানা গেছে।
বিজিবি ও কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত দেড় মাসে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৪৫টি অভিযান চালিয়ে ৩০০ কোটি টাকার বেশি মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হানিফুর রহমান বলেন, ‘সীমান্তে চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার ঠেকাতে বিজিবি দিনরাত কাজ করছে। ড্রোন, থার্মাল ইমেজার, রাডার, আধুনিক নৌযান ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’
এদিকে সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালান বন্ধ এবং টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য চালুর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির কারণে এত দিন বাণিজ্য বন্ধ ছিল। এখন এটি চালুর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুস শুক্কুর বলেন, সীমান্ত চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দ্রুত টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য চালু করা প্রয়োজন। এ জন্য মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও সমন্বয় জরুরি।
১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য চালু করা হয়েছিল। শুরুতে এর মাধ্যমে সীমান্ত চোরাচালান অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও পরবর্তী সময়ে তা আগের মতো কার্যকর থাকেনি।
কক্সবাজার-৪ আসনের (উখিয়া-টেকনাফ) সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ করতে তৎকালীন বিএনপি সরকার টেকনাফ স্থলবন্দর চালু করেছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থলবন্দর অচল করতে চোরাইপথে মাদকসহ বিভিন্ন মালামাল আনা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও বন্দরের কার্যক্রম সীমিত করা হলে চোরাচালান বেড়েছে কয়েকগুণ। বিশেষ করে মাদকের বড় বড় চালান এনে দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হয়। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। চোরাচালান বন্ধ করতে অচল সীমান্ত বাণিজ্য চালুর চেষ্টা চলছে।’
সিএ/এমই


