মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণ লেবাননভিত্তিক শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলার নামে ইসরায়েল দেশটিতে ব্যাপক বিমান ও স্থল হামলা চালাচ্ছে। এতে কয়েক দিনের মধ্যেই লেবাননে ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয় তীব্র আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৯৪ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে আরও প্রায় ১ হাজার ২৩ জন। নিহতদের মধ্যে রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলেই অন্তত ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্রমাগত হামলার ভয়ে হাজারো মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরপরই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। ওই ঘটনার পর হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে রকেট হামলা চালায়। বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনার পর তাদের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে বলে জানা গেছে।
গত সোমবার হিজবুল্লাহ দাবি করে যে তারা উত্তর ইসরায়েলের একটি সামরিক স্থাপনায় রকেট হামলা চালিয়েছে। এর পরই ইসরায়েল পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে লেবাননের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা শুরু করে। দক্ষিণ লেবানন ও রাজধানী বৈরুতে ওই হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হয় এবং আহত হয় আরও ১৪৯ জন। ইসরায়েল দাবি করছে তারা হিজবুল্লাহর সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, তবে বাস্তবে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যাই বেশি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে দেশকে নিরাপদ রাখতে লেবাননের দুর্বল সরকার হিজবুল্লাহর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং তাদের অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সরকারি এই নির্দেশ অমান্য করে সংগঠনটির যোদ্ধারা ইসরায়েলের ওপর রকেট হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সমর্থনপুষ্ট অ-রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর মধ্যে হিজবুল্লাহকে সবচেয়ে সংগঠিত ও শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই সংগঠনকে কেন্দ্র করে লেবাননের উত্তর সীমান্তে ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলের দিকে রকেট হামলা চালানো তাদের কাছে প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আর্থিক সহায়তা, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সমর্থন দিয়ে সংগঠনটির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তেহরান। এর বিনিময়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের স্বার্থ রক্ষায় হিজবুল্লাহ কাজ করে থাকে বলে ধারণা করা হয়।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিকে একটি বড় মানবিক জরুরি অবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
শুক্রবার ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলায় পূর্ব লেবাননের বেকা উপত্যকার নাবি চিত শহরে অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। হিজবুল্লাহর তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় শুক্রবার অন্তত ১৩ দফা বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে আতঙ্কে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
একই রাতে বেকা উপত্যকার বালবেক এলাকার কাছাকাছি একটি গ্রামেও ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, হামলার পর স্থানীয় যোদ্ধারা হালকা ও মাঝারি অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়।
লেবাননের পাশাপাশি সিরিয়া সীমান্তেও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, সিরিয়া সীমান্ত দিয়ে চারটি ইসরায়েলি হেলিকপ্টার প্রবেশের চেষ্টা করলে তাদের যোদ্ধারা রকেট হামলা চালিয়ে তা প্রতিহত করে।
এদিকে আল জাজিরার সাংবাদিক জিনা খদর জানিয়েছেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা হামলা চালিয়ে যাওয়ায় লেবানন সরকার আরও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে। কয়েক দিন আগে দেশটির সেনাবাহিনী দক্ষিণাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে হিজবুল্লাহর ১২ সদস্যকে আটক করেছে। এরপরও সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে সংগঠনটির যোদ্ধারা সক্রিয় রয়েছে।
রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে টানা কয়েক দিন ধরে ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকায় অন্তত ১০ হাজার মানুষ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে। একই সঙ্গে লেবাননে অবস্থানরত হাজার হাজার সিরীয় শরণার্থীও নিরাপত্তাহীনতায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম বলেন, মানবিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এই বাস্তুচ্যুতির ঘটনা অভাবনীয়। না চাইলেও আমাদের দেশ একটা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
সহায়তার জন্য লেবাননের প্রেসিডেন্ট যোসেফ আউন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। শনিবার তিনি ফোনে সাঁজোয়া যান ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপও প্রেসিডেন্ট আউনের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেবাননের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
এর আগে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের অভিযানে হিজবুল্লাহ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। সে সময় সংগঠনটির নেতা হাসান নাসরাল্লাহসহ অনেক যোদ্ধা নিহত হন এবং তাদের বিপুল অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করা হয়।
সিএ/এসএ


