সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে—দম্পতির সন্তান না হলে দায় যেন শুধুই নারীর। সন্তান ধারণে সমস্যা দেখা দিলে অধিকাংশ সময় সামাজিক চাপ, লজ্জা এবং নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় নারীদেরই। অনেক ক্ষেত্রে এটি এক ধরনের সামাজিক বোঝা বা অভিশাপের মতো হয়ে ওঠে।
মা হতে না পারার দায়ে নারীদের বিচার করা হলেও একই পরিস্থিতিতে পুরুষদের খুব কমই এমন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে পুরুষের বন্ধ্যত্ব নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
অনেকেই জানেন যে সন্তান না হওয়ার পেছনে পুরুষের শারীরিক কারণও থাকতে পারে। তবে পৌরুষে আঘাত লাগার ভয়, সামাজিক লজ্জা কিংবা অহংকারের কারণে এই বাস্তবতা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। ফলে সমস্যাটি দীর্ঘদিন অস্বীকারের মধ্যে পড়ে থাকে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মানসিকতায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ধীরে হলেও অনেক পুরুষ এখন বুঝতে শুরু করেছেন যে একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দেওয়া শুধু নারীর দায়িত্ব নয়, এতে পুরুষেরও সমান ভূমিকা রয়েছে। সেই উপলব্ধি থেকেই অনেকেই নিজেদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন নিয়ে সচেতন হচ্ছেন।
বিভিন্ন গবেষণাও এই সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছে। একাধিক মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, ১৯৭৩ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোতে পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। ২০২২ সালের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই প্রবণতা এখন শুধু পশ্চিমা দেশেই সীমাবদ্ধ নেই; এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, আধুনিক জীবনযাপনের নানা পরিবর্তন এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়া, মানসিক চাপ বৃদ্ধি এবং পরিবেশে থাকা বিভিন্ন এন্ডোক্রাইন-ডিসরাপ্টিং কেমিক্যাল যেমন প্লাস্টিক, কীটনাশক বা রাসায়নিক সার প্রজননক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে করা গবেষণায় দেখা গেছে, বন্ধ্যত্বের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষদের কারণ জড়িত। তরুণদের মধ্যেও এই সমস্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে অনেক পুরুষ এখন নিজেদের জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছেন। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে জাঙ্ক ফুড কমিয়ে জিঙ্ক, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে।
সবুজ শাকসবজি, ফলমূল ও পুষ্টিকর খাদ্য শুক্রাণুর গুণমান উন্নত করতে সহায়তা করে—এই বিষয়েও সচেতনতা বাড়ছে।
এ ছাড়া অনেক পুরুষ এখন নিজের শরীর সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন। কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস যেমন দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ কোলে রাখা, অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করা কিংবা খুব আঁটসাঁট অন্তর্বাস পরা শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে শুক্রাণুর গুণমান কমিয়ে দিতে পারে—এ বিষয়েও সচেতনতা বাড়ছে।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনেও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। ধূমপান ও মদ্যপান কমানো বা বর্জন করা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং মানসিক চাপ কমানোর মতো অভ্যাসের দিকেও নজর দিচ্ছেন অনেকেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু সন্তান ধারণের সম্ভাবনাই বাড়াচ্ছে না, বরং পুরুষত্ব নিয়ে প্রচলিত পুরোনো ধারণাকেও বদলে দিচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনায় সমান দায়িত্ব নেওয়া এবং নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হওয়াকে এখন আধুনিক পুরুষের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিএ/এমআর


