মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং খাতে কনটেইনার পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। চীন থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা কাঁচামাল পরিবহনে ৪০ ফুটের কনটেইনারের চার্জ প্রতি ইউনিটে ২০০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলার বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধ মাশুলও কার্যকর করার ঘোষণা দিচ্ছে শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকসহ সমগ্র আমদানি-রফতানি বাণিজ্য চাপের মুখে পড়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত সাড়ে তিন লাখ কনটেইনার নিয়ে ১৪০টি মাদার ভ্যাসেল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ভাসছে। নিরাপত্তার কারণে এসব জাহাজ কোনো বন্দরে বার্থিং নিতে পারছে না, ফলে কনটেইনার খালাসও সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণে পরিবহন খরচও বাড়ছে।
এমএসসি শিপিং ইন্টারন্যাশনালের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, “প্রতিটি জাহাজ ভাসমান অবস্থায় প্রতিদিন ফুয়েল বার্ন করছে। চার্টার হায়ার খরচের কারণে অপারেশন খরচও প্রতিদিন বাড়ছে।”
প্রথম পর্যায়ে চীন থেকে বাংলাদেশে আসা কাঁচামালের জন্য ৪০ ফুট সাইজের কনটেইনার পরিবহন ভাড়া ২০০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি করা হয়েছে। যদিও শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ৫০০ ডলার বাড়তি ভাড়া দাবি করেছিল। একই সঙ্গে প্রতি কেজিতে এয়ার ফ্রেইটের দাম ৩ থেকে সাড়ে ৩ মার্কিন ডলার বেড়েছে।
বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, “আমদানিতে চাপ বেড়েছে, বুকিং প্রক্রিয়ার কারণে প্রাইসও বৃদ্ধি পেয়েছে। হিসাব করলে আমরা লসের দিকে যাচ্ছি।”
যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান, ইরাক, বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও আরব আমিরাতে কার্গো পরিবহন করতে বিমান সংস্থাগুলোও রাজি হচ্ছে না। ২০ ফুটের কনটেইনারে ২ হাজার, ৪০ ফুটের কনটেইনারে ৩ হাজার এবং বিশেষ পণ্যবাহী কনটেইনারে ৪ হাজার মার্কিন ডলার যুদ্ধ চার্জ বসানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রতি মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করে। ইউরোপ ও আমেরিকার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও রফতানি হয়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এসব দেশে রফতানি প্রায় বন্ধ।
হুতি বিদ্রোহীদের কারণে লোহিত সাগর আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে বিকল্প প্রণালির তেমন কোনো উপায় নেই। এতে সময় ১২ থেকে ১৫ দিন বেড়ে যাবে এবং জাহাজের খরচও বৃদ্ধি পাবে।
জিবিএক্স লজিস্টিকস লিমিটেডের হেড অব অপারেশন মুনতাসির রুবায়েত বলেন, “রফতানিতে ফ্রেট খরচ বাড়ার কারণে গার্মেন্টসের কনট্রিবিউশন মার্জিন কমবে। আমদানিকারককে বেশি মূল্য দিতে হবে, যা ভোক্তার ওপরও প্রভাব ফেলবে।”
ট্রাম্প প্রশাসনের ট্যারিফ জটিলতা সমাধান না হওয়ায় নতুন করে জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া বৃদ্ধি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বহুমুখী সংকটে ফেলতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব বলেন, “পণ্যগুলো যেখানে বিক্রি হবে, সেখানে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিক্রি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের পোশাক শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।”
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের মূল উৎস তৈরি পোশাক খাত, যার পরিমাণ বছরে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।
সিএ/এসএ


