স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয় ব্যবস্থা কার্যকর করার পথে এগোচ্ছে সরকার। সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ—সব পর্যায়ের নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে অংশগ্রহণের বিধান বাতিলের প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে শুক্রবার ( ৫ ডিসেম্বর) শনিবার (৬ ডিসেম্বর) রোববার (৭ ডিসেম্বর)।
সরকারি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুমোদিত একটি অধ্যাদেশের ধারাগুলো নতুন আইনে সংযুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয় নির্বাচন (সিটি করপোরেশন) আইন ২০২৬ মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের পর তা জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে। সংসদে আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে নাকি নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে।
নতুন প্রস্তাবিত আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণের ক্ষমতা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছেই রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের বিধানও বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
মন্ত্রিসভায় উঠছে সংশোধনী প্রস্তাব
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার বিধান বাতিল করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সে সরকারে অনুমোদন পাওয়া অধ্যাদেশের ধারাগুলো নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে। সেখানে ধারাগুলো অনুমোদন পেলে প্রস্তাবটি সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হবে। সংসদই ঠিক করবে, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে নাকি নির্দলীয় হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিষয়গুলো মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদে আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে না।
প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০২৬–এ ২০১৫ সালের সংশোধিত আইনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩২ক ধারা, যেখানে বলা ছিল মেয়র পদে প্রার্থী হতে হলে কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হবে। এ ধারা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৫ সালের সংশোধিত আইনের ৩৫ নম্বর ধারাও বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে প্রার্থীদের রাজনৈতিক দলভিত্তিক অংশগ্রহণের বিষয় উল্লেখ ছিল। তবে ১৩ক ও ২৫ক ধারা বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ১৩ক ধারায় জনস্বার্থে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করতে পারবে বলে উল্লেখ আছে। আর ২৫ক ধারায় প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় রাখার দাবি দীর্ঘদিনের
২০১৫ সালে সংশোধিত আইনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে চালু করেছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালুর ফলে মনোনয়ন–বাণিজ্য, সহিংসতা এবং অযোগ্য প্রার্থীর আধিক্য বেড়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে সম্মানিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ কমে গেছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনবিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছিলেন। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এবং স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনও দলীয় প্রতীক বাতিলের সুপারিশ করেছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের জুলাইয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাতিল করে। বর্তমান সরকার সেই অবস্থান বহাল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করার পর স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো মাঠপর্যায়ে সংগঠন সক্রিয় করছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় নির্বাচন কার্যক্রম শুরু হতে পারে। তবে তার আগে ১২ মার্চ শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট আইন পাস হওয়া প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন দেশের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। এতে সহিংসতা, প্রার্থীসংকট এবং অযোগ্য প্রার্থীর আধিক্য দেখা গেছে। তাঁর মতে, স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্দলীয় নির্বাচন প্রয়োজন।
সিএ/এমই


