চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় সাম্প্রতিক একাধিক গুলির ঘটনায় প্রশিক্ষিত শুটারদের সম্পৃক্ততার দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শত মানুষের ভিড়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি, পুলিশ পাহারায় থাকা বাসভবনে হামলা কিংবা চলন্ত গাড়িতে যাত্রীকে টার্গেট করে গুলিবর্ষণের মতো ঘটনাগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে এসএমজিসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র। এসব ঘটনায় জড়িতদের ধরতে না পারা এবং অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থতা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে পুলিশ।
সর্বশেষ গত শনিবার (৬ ডিসেম্বর) সকালে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলি চালায় চারজন অস্ত্রধারী। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একজন দুই হাতে দুটি পিস্তল থেকে গুলি ছুড়ছেন। অন্যদের হাতে ছিল এসএমজি, চায়নিজ রাইফেল ও শটগান। পুলিশ বলছে, অস্ত্র ব্যবহারের ধরন দেখে তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত—এরা প্রশিক্ষিত শুটার। ব্যবসায়ীর দাবি, কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে এ হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে নগরের খন্দকারপাড়া এলাকায় জনসংযোগকালে গুলি করে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে হত্যা করা হয়। খুব কাছ থেকে গুলি চালানো ওই ঘটনায় প্রশিক্ষিত শুটারের সম্পৃক্ততার কথা বলছে পুলিশ। একইভাবে রাউজানের পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট বাজারে যুবদল কর্মী আবদুল মজিদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলটি পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থেকে অল্প দূরত্বে হলেও হামলাকারীরা দ্রুত সরে পড়ে।
গত বছরের অক্টোবরে হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকায় চলন্ত প্রাইভেট কারে গুলি করে বিএনপি কর্মী আব্দুল হাকিমকে হত্যা করা হয়। তাঁর গাড়িতে ২২টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। একই বছরের মার্চে বাকলিয়া এক্সেস রোডে গুলি করে দুজনকে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন ঘটনায় একই ধরনের কৌশল ব্যবহারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নেতৃত্বাধীন চক্রে অন্তত ৫০ জন প্রশিক্ষিত শুটার রয়েছে। দেশে তাঁর সহযোগী হিসেবে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ, মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের নাম এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার তথ্য রয়েছে। অভিযোগ, চাঁদা না দিলে বা বিরোধে জড়ালে এসব শুটারকে ব্যবহার করা হয়।
পুলিশ জানায়, ‘এ’ ক্যাটাগরির সদস্যরা পরিকল্পনা করেন, ‘বি’ ক্যাটাগরির শুটাররা সরাসরি হামলায় অংশ নেন এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির সদস্যরা পাহারা ও পালানোর পথ তৈরি করেন। রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
বিদেশে বসে খুন-চাঁদাবাজির অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে সাজ্জাদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদেশে ব্যবসা করি, দেশে ভাড়া ঘর থেকেও আয় আছে। আমাদের পরিবার বিত্তশালী। আমি কেন বাহিনী তৈরি করব? উল্টো আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।’ তিনি দাবি করেন, ছোট সাজ্জাদ বা রায়হানের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদের গড়ে তোলা এই বাহিনীই নগর ও জেলায় খুন, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজির ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে।
চন্দনপুরায় ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলির ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। থানায় মামলাও হয়নি। নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রশিক্ষিত শুটার ছাড়া এভাবে প্রকাশ্যে এসে গুলি করা সম্ভব নয়। তাদের যেভাবে গুলি করতে দেখা গেছে, তাতে তারা আত্মবিশ্বাসী ও প্রশিক্ষিত বলে মনে হয়েছে।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবুল আজাদ বলেন, অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এর আগে জানুয়ারিতে একই ব্যবসায়ীর বাসায় গুলির ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়।
সিএ/এমই


