রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনকে ঘিরে আয়োজিত ‘আলো’ শীর্ষক শিল্প-প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল রোববার (৭ ডিসেম্বর) ছিল আয়োজনের ১২তম দিন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনীতিক, পেশাজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এসে ধ্বংসস্তূপ ঘুরে দেখেন এবং প্রতিক্রিয়া জানান।
শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান হামলায় ক্ষতবিক্ষত ভবনের ধ্বংসাবশেষকে শিল্পভাষায় উপস্থাপন করেছেন। পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই ও নথিপত্র প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অনেক দর্শনার্থী এসব দেখে আবেগাপ্লুত হন। কেউ কেউ বলেন, ঘটনাটির ভয়াবহতা তাঁদের ধারণার চেয়েও বেশি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গোলাম কিবরিয়া বড় ভাই ইয়াসিন আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে প্রদর্শনীতে আসেন। চোখে দেখতে না পারা এই দর্শনার্থী শিল্পবস্তু স্পর্শ করে হামলার মাত্রা বোঝার চেষ্টা করেন। উপস্থিত অনেকেই বলেন, প্রথম আলো কার্যালয়ে যে আক্রমণ হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজ বা সভ্য মানুষের কাজ নয়। এটা উগ্রপন্থী মনোভাবের প্রকাশ। হামলার বিচার দাবি করেন তাঁরা।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীরা প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। তবে এই বিপর্যয়ের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত কার্যক্রমে ফিরে আসে।
গতকাল প্রদর্শনীতে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। ঘুরে দেখার পর তিনি বলেন, ভেতরে কতটা ঘৃণার চাষ এবং সেটার অভিব্যক্তি কতটা ভয়ানক হলে মানুষ এমন ঘটনা ঘটাতে পারে! এ হামলা সবার বাংলাদেশ গড়ার যে আওয়াজ, তার বিরুদ্ধের আওয়াজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহমান মৈশান বলেন, মতপ্রকাশের কারণে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এ হামলা নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদী আচরণ।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায় ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মিঠু রঞ্জন দেবও প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। পরে মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায় বলেন, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তা মোকাবিলা করতে হবে যুক্তি দিয়ে। গণমাধ্যমের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া বা কণ্ঠরোধ করা যাবে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, এ আক্রমণ বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটা বড় চক্রান্ত। এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের আহ্বান জানান তিনি।
১২তম দিনে সকালে প্রদর্শনী দেখতে আসেন দ্য ডেইলি স্টার–এর কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ। এ আয়োজনকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো যে ঘটনাটা কত ভয়াবহ ছিল, অন্যদিকে আমরা যে ঘুরে দাঁড়াতে পারি, গণমাধ্যম যে দুর্বল নয়, সেটারও প্রমাণ রাখা গেল।
দুপুরে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম প্রোগ্রামের একদল শিক্ষার্থী তাঁদের সহকারী অধ্যাপক সৌমিক পালের তত্ত্বাবধানে প্রদর্শনী দেখতে আসেন। সৌমিক পাল এ উদ্যোগকে জরুরি উল্লেখ করেন। শিক্ষার্থী ঋতু বলেন, ‘এত কিছুর পরও প্রথম আলো থেমে যায়নি। এ সাহসটাই আমাদের অনুপ্রাণিত করছে।’
রংপুর থেকে আসা নিয়মিত পাঠক আনসার আলী (৬৫) বলেন, এখানে এসে হামলার ভয়াবহতাটা বুঝতে পারলাম। একটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ জহুরা বেগম, স্থপতি ইকবাল হাবিব, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পীসহ আরও অনেকে গতকাল প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।
১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীর আজ শেষ দিন। সোমবারও বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
সিএ/এমই


