মৌলভীবাজার শহর থেকে কালেঙ্গা সড়ক ধরে বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক অতিক্রম করলেই টিলার ওপর চোখে পড়ে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়। নিরিবিলি সবুজে ঘেরা এই সরকারি কার্যালয় এলাকাজুড়ে বসন্তে ফুটেছে পলাশ ফুল। গাছের ডালে থোকা থোকা টকটকে লাল ফুল যেন দূর থেকে আগুনের গোলার মতো ঝুলে আছে। চারপাশের গভীর সবুজের ভেতর এ দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অন্যরকম আবেশ তৈরি করে।
কার্যালয়ের ভেতরেই রয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাসভবন। সেখানে যাওয়ার পাকা পথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে নানা প্রজাতির গাছ, বিশেষ করে সারি সারি নাগেশ্বরগাছ। বসন্তের শুরুতে এ পথ ধরেই চোখে পড়ে পলাশের রঙিন বিস্ফোরণ। কখনো মনে হয়, বনের শাখা-প্রশাখার মাথায় কেউ যেন আগুনের শিখা বেঁধে দিয়েছে।
সম্প্রতি কার্যালয়ে গিয়ে বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদি সরোয়ার জানান, কয়েক বছর ধরেই এই নির্জন বনের ভেতরে পলাশ ফুল ফুটছে। তিনি বলেন, এখানে গাছে পলাশ ফুল ফুটেছে। বেশ কয়েক বছর ধরেই নিভৃত বনের ভেতর এই পলাশ ফুটছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কার্যালয়ের কাছের একটি গাছে অল্পসংখ্যক ফুল থাকলেও সামনে বাঁক নিয়ে একটু এগোলেই দেখা মেলে দুইটি গাছে অসংখ্য পলাশের সমাহার।
ঝকঝকে রোদের আলোয় ফুলগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। টকটকে লাল রঙ চারপাশের সবুজকে যেন চ্যালেঞ্জ জানায়। মাঝে মাঝে কাঠশালিক, বুলবুলি ও শালিক এসে বসছে ডালে ডালে। এক ডাল থেকে আরেক ডালে উড়ে গিয়ে বসার ফাঁকে ঝরে পড়া পাপড়িগুলো নিচে খয়েরি পাতার সঙ্গে মিশে তৈরি করছে অনন্য নকশা। প্রকৃতির এই দৃশ্য নীরবতা ভেঙে দেয় পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দে।
পলাশ মাঝারি আকারের একটি পর্ণমোচী বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম বিউটিয়া মোনোসপারমা এবং এটি ফাবিসিয়ে পরিবারের সদস্য। তবে গাছটি ফুলের জন্যই অধিক পরিচিত। সংস্কৃতিতে পলাশের আরেক নাম কিংশুক। গাছটি সাধারণত সর্বোচ্চ ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। শীতকালে এর পাতা ঝরে যায় এবং বসন্তের শুরুতেই ডালে ডালে ফুটে ওঠে রঙিন ফুল।
পলাশগাছের বাকল ধূসর বর্ণের, শাখা-প্রশাখা ও কাণ্ড কিছুটা আঁকাবাঁকা। নতুন পাতা রেশমের মতো সূক্ষ্ম এবং পরিণত হলে গাঢ় সবুজ রঙ ধারণ করে। পাতা ত্রিপত্রী এবং দেখতে মান্দার গাছের পাতার মতো হলেও আকারে তুলনামূলক বড়। সাধারণত বসন্তেই ফুল ফোটে। টকটকে লাল ছাড়াও হলুদ ও লালচে আভাযুক্ত ফুলও দেখা যায়। প্রতিটি ফুলের দৈর্ঘ্য দুই থেকে চার সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফল দেখতে অনেকটা শিমের মতো।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পলাশগাছ দেখা যায়। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া পর্যন্ত এর বিস্তৃতি রয়েছে। তবে মৌলভীবাজারের এই নিরিবিলি বনের ভেতর পলাশের যে রূপ ধরা দিয়েছে, তা যেন প্রকৃতির নিজস্ব আয়োজনেই সাজানো এক অনুপম প্রদর্শনী।
সিএ/এমই


