দেশে ২০২৫ সালে মোট ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থী ১৯০ জন, যা মোট সংখ্যার ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন বা ২২ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ভার্চুয়ালি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ফাউন্ডেশনের গবেষণায় বলা হয়, ১৬৫টি জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মোট আত্মহত্যাকারীর মধ্যে ২৪৯ জন (৬১ দশমিক ৮ শতাংশ) নারী এবং ১৫৪ জন (৩৮ দশমিক ২ শতাংশ) পুরুষ। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার তুলনামূলক বেশি হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য বেশি।
শিক্ষাস্তরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, স্কুলে ১৯০ জন (৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ), কলেজে ৯২ জন (২২ দশমিক ৮ শতাংশ), বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন (১৯ দশমিক ১০ শতাংশ) এবং মাদরাসায় ৪৪ জন (১০ দশমিক ৭২ শতাংশ) শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোরের আবেগীয় অস্থিরতা ও পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতি স্কুল শিক্ষার্থীদের বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে।
কারণ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, হতাশা ২৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ, অভিমান ২৩ দশমিক ৩২ শতাংশ, প্রেমঘটিত কারণ ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ, পারিবারিক টানাপোড়েন ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ, মানসিক অস্থিতিশীলতা ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং যৌন নির্যাতন ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। একাডেমিক চাপের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৭২ জন শিক্ষার্থী। স্কুল পর্যায়ে অভিমান (৩২ দশমিক ৬১ শতাংশ) ও একাডেমিক চাপ (২৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ) প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অন্তত একজন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৬৬ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা মোট ঘটনার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এছাড়া ১২ বছর বয়সী ৪৪ শিশুর আত্মহত্যার ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচয় সংকট, সামাজিক তুলনা, প্রেমঘটিত টানাপোড়েন ও একাডেমিক চাপ এ বয়সে বড় ভূমিকা রাখছে।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১৮ জন (২৯ দশমিক ২৪ শতাংশ) শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামে ৬৩ জন, বরিশালে ৫৭ জন এবং রাজশাহীতে ৫০ জনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৪ জন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ জন, মেডিকেল কলেজে ৬ জন এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজে ১০ জন আত্মহত্যা করেছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হতাশা ও প্রেমঘটিত কারণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে হতাশার হার আরও বেশি বলে জানানো হয়।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে আঁচল ফাউন্ডেশন পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং চালু, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মানসিক সংকট শনাক্তে প্রশিক্ষণ, আত্মহত্যা বিষয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও কলঙ্ক দূরীকরণে প্রচারণা, প্রাথমিক শিক্ষকদের সাইকো-সোশ্যাল প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবক-শিক্ষার্থীর মধ্যে যোগাযোগ জোরদার।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, এই ৪০৩টি মৃত্যু শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং ৪০৩টি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। এখনই কাঠামোগত পরিবর্তন ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সিএ/এএ


