স্বপ্ন শুধু অবচেতন মনের কল্পনার প্রকাশ নয়, বরং মানসিক অসুস্থতা নিরাময়ের একটি সম্ভাবনাময় উপায় হিসেবেও কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, স্বপ্নের ওপর সচেতন নিয়ন্ত্রণ অর্জনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের মানসিক ট্রমা, উদ্বেগ ও দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে।
আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী পপুলার মেকানিক্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা দুঃস্বপ্নের মধ্যেই বুঝতে পারেন যে তারা স্বপ্ন দেখছেন এবং ইচ্ছামতো নিজেকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হন, তারা আসলে ‘লুসিড ড্রিমিং’-এর অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। এ ধরনের স্বপ্নে স্বপ্নদ্রষ্টা সচেতন থাকেন এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বপ্নের ভেতরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও তার থাকে।
গবেষকদের মতে, এই লুসিড ড্রিমিংয়ের মধ্যেও একটি বিশেষ ধরন রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘লুসিড কন্ট্রোল ড্রিম’। এতে স্বপ্নদ্রষ্টা শুধু সচেতনই নন, বরং নিজের আচরণ ও স্বপ্নের দৃশ্যপট সক্রিয়ভাবে বদলাতে পারেন। এই বিশেষ অভিজ্ঞতাকেই ভবিষ্যতে চিকিৎসার বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি এবং অন্যান্য কারণে দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নে ভোগা রোগীদের নিয়ে পরিচালিত আগের গবেষণাগুলো পর্যালোচনা করেছেন। তারা খতিয়ে দেখেছেন, একটি নিয়ন্ত্রিত স্বপ্ন কীভাবে অন্য ধরনের দুঃস্বপ্নের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, লুসিড কন্ট্রোল ড্রিমের সময় মস্তিষ্কের কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় থাকে। এর মধ্যে রয়েছে ডরসোল্যাটারাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা মানুষের চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্তগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি ভেন্ট্রোমিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সও সক্রিয় হয়, যা মানুষের বিশ্রামকালীন স্নায়বিক নেটওয়ার্ক ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া আত্মসচেতনতার সঙ্গে জড়িত টেমপোরোপ্যারাইটাল জাংশন ও প্রিকিউনিয়াস নামের মস্তিষ্কের অংশগুলোও এই প্রক্রিয়ায় কাজ করে। অ্যামিগডালা ও হিপোক্যাম্পাসের যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে স্মৃতি ও আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়, যা স্বপ্নদ্রষ্টাকে স্বপ্নের ভেতরে সক্রিয় ভূমিকা নিতে সহায়তা করে।
গবেষকরা মনে করছেন, মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের এই সমন্বয়ের মাধ্যমে লুসিড ড্রিমিংকে দুঃস্বপ্ন ও ট্রমা মোকাবিলার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে বিষয়টি চিকিৎসার মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করার আগে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন বলে তারা সতর্ক করেছেন।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল জার্নাল অফ মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি-তে।
সিএ/এমআর


