সৌরজগতের ভেতরে ও বাইরে পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অনুসন্ধানের মূল লক্ষ্য হলো, বিশাল এই মহাবিশ্বে কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা জানা। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে সেসব গ্রহ, যেগুলো সূর্যের মতো কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে এবং যাদের আকার ও ঘনত্ব পৃথিবীর কাছাকাছি। এমন গ্রহে পানিকে তরল অবস্থায় ধরে রাখার মতো পরিবেশ থাকার সম্ভাবনাও থাকে। সৌরজগতের বাইরের এসব গ্রহকে এক্সোপ্ল্যানেট বলা হয়।
১৯১৭ সালে প্রথমবারের মতো এক্সোপ্ল্যানেটের অস্তিত্বের আভাস পাওয়া গেলেও সে সময় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রথম এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করা হয় ১৯৮৮ সালে এবং পরে ২০১২ সালে সেটি নিশ্চিত করা হয়। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় আবিষ্কৃত এক্সোপ্ল্যানেটের সংখ্যা ৫ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে।
এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীরা সাধারণত ট্রানজিট ফটোমেট্রি ও ডপলার স্পেকট্রস্কোপি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রহ ঘুরছে। ধারণা করা হয়, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে, যেখানে প্রায় ১১ বিলিয়ন পৃথিবীর মতো আকৃতির বাসযোগ্য গ্রহ থাকতে পারে। এই সংখ্যা বেড়ে ৪০ বিলিয়ন পর্যন্ত হতে পারে বলেও বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
সম্প্রতি এই গবেষণায় নতুন এক মাইলফলক যোগ হয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ১৪৬ আলোকবর্ষ দূরে একটি নতুন এক্সোপ্ল্যানেটের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। নতুন আবিষ্কৃত এই গ্রহটির সঙ্গে পৃথিবীর আশ্চর্য মিল রয়েছে। গ্রহটির নাম দেওয়া হয়েছে এইচডি-১৩৭০১০ বি।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে নাসার কেপলার স্পেস টেলিস্কোপের সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে ট্রানজিট পদ্ধতিতে এই গ্রহটি শনাক্ত করা হয়। কোনো গ্রহ যখন তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে, তখন নক্ষত্রের আলো সাময়িকভাবে কিছুটা কমে যায়। সেই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই গ্রহটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, এইচডি-১৩৭০১০ বি গ্রহটির কক্ষপথের বৈশিষ্ট্য অনেকটাই পৃথিবীর মতো। পৃথিবী যেমন সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ৩৬৫ দিন সময় নেয়, এই গ্রহটির ক্ষেত্রে সময় লাগে ৩৫৫ দিন। অর্থাৎ, এর এক বছর পৃথিবীর বছরের প্রায় সমান। আকারেও এটি পৃথিবীর তুলনায় খুব বেশি বড় নয়, মাত্র ১.০৬ গুণ।
গ্রহটি একটি কে-টাইপ বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে। নক্ষত্রটির ভর সূর্যের ভরের প্রায় ৭০ শতাংশ। সূর্যের তুলনায় এর উজ্জ্বলতা কম হলেও আয়ু অনেক দীর্ঘ। ফলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই নক্ষত্র ও এর গ্রহ দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
তবে গ্রহটির তাপমাত্রা বেশ কম। বর্তমানে এর গড় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৬৮ থেকে ৮৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে, যা আমাদের প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলের চেয়েও ঠান্ডা। তবুও বিজ্ঞানীদের ধারণা, এত শীতল পরিবেশের মধ্যেও এই গ্রহে প্রাণ ধারণের উপযোগী পরিস্থিতি থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৫১ শতাংশ। কারণ, যদি গ্রহটির কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল থাকে, তবে গ্রিনহাউস এফেক্টের মাধ্যমে সেখানে পানি তরল অবস্থায় থাকতে পারে। আর পানি থাকলে জীবনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পৃথিবীর ইতিহাসেও একাধিকবার পুরো গ্রহ বরফে ঢাকা স্নো-বল আর্থ অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে।
এই ধরনের এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার বহির্জাগতিক প্রাণ অনুসন্ধানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন বিশেষভাবে হ্যাবিটেবল জোনে থাকা গ্রহগুলোর দিকে নজর দিচ্ছেন। পাশাপাশি নক্ষত্রহীন ভ্রাম্যমাণ গ্রহগুলোর প্রতিও গবেষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
সিএ/এমআর


