রাজশাহীর বাটার মোড়ে অবস্থিত এই ছোট্ট জিলাপি দোকান ৭৫ বছরের বেশি সময় ধরে একই জায়গায় চলে আসছে। দোকানের কোনো নাম বা সাইনবোর্ড নেই, তবু স্থানীয়রা জানেন, মচমচে ও টসটসে জিলাপি পেতে হলে এখানে আসতেই হবে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের দিকে এমন ভিড় দেখা যায়, যা সাধারণত রমজানে লক্ষ্য করা যায়।
বেলা আড়াইটার দিকে দোকানের সামনে ক্রেতাদের ঘন্টা দাড়ি লাইন লক্ষ্য করা যায়। কেউ তিন কেজি, কেউ এক কেজি, আবার কেউ ইচ্ছেমতো পরিমাণে জিলাপি কিনছেন। ভেতরে দুইজন কারিগর ব্যস্ত হাতে জিলাপি তৈরি ও ভাজছেন। চুলা থেকে নামানো গরম জিলাপি মুহূর্তেই প্যাকেটে ভরে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ক্রেতারা সঙ্গে নিচ্ছেন নিমকি ও মাঠা।
দোকানটির ইতিহাস ১৯৫০ সালে শুরু হয়। ব্যবসা শুরু করেন সোয়েব উদ্দিন। তখন একমাত্র কারিগর ছিলেন জামিলী সাহা। ১৯৭২ সালে তাঁর ছেলে কালীপদ সাহা বাবার সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ১৯৮০ সালে জামিলী সাহা মারা গেলে কালীপদ সাহা প্রধান কারিগর হন। তিনি ২০১৭ সালে মারা যান। এরপর থেকে তাঁর শিষ্য মো. সাফাত এই জিলাপির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তার সঙ্গে আছেন আরও একজন কারিগর।
সোয়েব উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর চার ছেলে দোকানটি পরিচালনা করছেন। মো. শামীম বলেন, ‘এটা ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। এই জিলাপিতে কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। যদিও ব্যবহার ছাড়া ভালো জিলাপি তৈরি করা কঠিন, তবু আমরা বাপ-দাদার রেখে যাওয়া ব্যবসাকে ধরে রেখেছি।’ তিনি আরও বলেন, সততা এবং ভালো মানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে দোকানটি সারা বছরই বিক্রি করে। রমজানে বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
দোকানের কারিগর মো. সাফাত ৪৩ বছর ধরে জিলাপি বানাচ্ছেন। তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, সব উপকরণ ঠিক রাখতে হয়। ‘এটা সবাই ভাজতে পারে না।’ সাফাতের নিপুণ হাতে কড়াইয়ের গরম তেলে জিলাপি গোল হয়ে ফুটে ওঠে, তারপর রসে ডুবানো হয়। প্রতি কেজি জিলাপির দাম বর্তমানে ২২০ টাকা। বিকেলের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানের সামনে লাইন থাকে।
রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি তানভিরুল হক বলেন, বাটার মোড়ের জিলাপি রাজশাহীর এক ধরনের ঐতিহ্য। শুধু রমজানে নয়, সারা বছরই মানুষ এখানে আসে। রমজানে এখানকার জিলাপি দিয়ে ইফতার করার আলাদা মাহাত্ম্য আছে।
স্থানীয় পবা উপজেলার বসুয়া গ্রামের মো. শাহিন বলেন, এত ভালো জিলাপি রাজশাহীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। ছোটবেলা থেকেই এখান থেকেই কিনে খাচ্ছি। স্বাদটা আলাদা। মো. রাফাত বলেন, ‘প্রতি রমজানের ইফতার শুরু হয় এই জিলাপি দিয়ে। আজ দুপুর বেলাতেই আসতে হলো, বিকেলে প্রচণ্ড ভিড় হতে পারে।’
সিএ/এমই


