পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে বিপুল পরিমাণ জীবনের অপরিহার্য উপাদান হাইড্রোজেনের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর কেন্দ্রে অন্তত ৪৫টি মহাসাগরের সমান হাইড্রোজেন মজুত থাকতে পারে। গবেষণায় উঠে এসেছে, পৃথিবীর পৃষ্ঠের মহাসাগরগুলো যেখানে মোট এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে, সেখানে গ্রহটির অভ্যন্তরে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি সব মহাসাগরের প্রায় ৯ গুণ জায়গাজুড়ে বিস্তৃত।
ন্যাচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়, পৃথিবীর কেন্দ্রের মোট ওজনের প্রায় শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত হাইড্রোজেন থাকতে পারে। গবেষণার প্রধান লেখক পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড স্পেস সায়েন্সেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ডংইয়াং হুয়াং জানান, এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে পৃথিবী গঠনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই অধিকাংশ পানি গ্রহটির কেন্দ্রে যুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ পরবর্তী সময়ে ধূমকেতুর আঘাতে পানি আসার ধারণাকে এই গবেষণা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ডংইয়াং হুয়াং বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম এক মিলিয়ন বছরের মধ্যেই অধিকাংশ পানি কেন্দ্রে সঞ্চিত হয়েছিল। বর্তমানে যেখানে জীবনের অস্তিত্ব রয়েছে, সেই পৃষ্ঠভাগে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম পানি রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর কেন্দ্র মূলত লোহা ও নিকেল দিয়ে গঠিত একটি অত্যন্ত উষ্ণ ও ঘন তরল স্তর, যা গ্রহটির চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে ঠিক কতটা হাইড্রোজেন রয়েছে, তা জানার চেষ্টা চলছিল। তবে কেন্দ্রের গভীরতা ও অতিরিক্ত চাপ-তাপমাত্রার কারণে সরাসরি পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়।
হাইড্রোজেন অত্যন্ত হালকা মৌল হওয়ায় এর পরিমাণ নির্ধারণ করাও জটিল। আগের গবেষণাগুলোতে এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন পদ্ধতিতে অনুমান করা হলেও ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। নতুন এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ডায়মন্ড অ্যানভিল সেল ব্যবহার করে পৃথিবীর কেন্দ্রের উচ্চ চাপ ও তাপমাত্রার অনুকরণ করেন। লেজার দিয়ে লোহা গলিয়ে অ্যাটম প্রোব টোমোগ্রাফি প্রযুক্তির মাধ্যমে পরমাণুস্তরে বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শীতল হওয়ার সময় লোহায় হাইড্রোজেন, সিলিকন ও অক্সিজেনের অনুপাত প্রায় ১:১ ছিল। এ তথ্যকে আগের সিলিকনের হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে কেন্দ্রে মোট হাইড্রোজেনের পরিমাণ অনুমান করা হয়েছে।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেই হিরোসে জানান, তাঁর আগের গবেষণাতেও কেন্দ্রের ওজনের শূন্য দশমিক ২ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হাইড্রোজেনের কথা বলা হয়েছিল, যা নতুন গবেষণার ফলাফলের কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণা গ্রহ গঠন ও পৃথিবীতে জীবনের বিকাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করবে।
সিএ/এমআর


