ঘটনাবহুল সময়, গভীর সংশয় পেরিয়ে ভোটের দিন
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রশ্ন ছিল—নির্বাচন আদৌ হবে কি না। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্ন ঘিরে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা, স্মৃতি আর তুলনার দীর্ঘ ছায়া। এই সংশয়ের আবহ নতুন নয়; বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে এমন সময় আগেও এসেছে, যখন ভোটের আগে অপেক্ষা আর সন্দেহ একসঙ্গে পথ হেঁটেছে।
সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সভা কিংবা অনানুষ্ঠানিক আড্ডায় একই প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। এই প্রশ্ন শুনলেই স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ২০০৭ সালের সময়কাল। তখন নির্বাচন কমিশন বিটে কাজ করতে গিয়ে পাড়া-মহল্লা থেকে পারিবারিক পরিসর—সবখানেই শোনা যেত, নির্বাচন হবে তো। সেই সময়ের মতোই ২০০৮ সালের নির্বাচনও হয়েছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি ও গভীর সংশয়ের ভেতর দিয়ে।
এই সংশয়ের পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্দলীয় সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯১ সালে। পরে মাগুরা উপনির্বাচনের অভিযোগ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়। এর ধারাবাহিকতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত হয় সংবিধানে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, ২০০১ সালে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট।
২০০৪ সালে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোকে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নির্বাচন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। ২০০৬ সালে বিচারপতি কে এম হাসানের দায়িত্ব নিতে অসম্মতির পর রাষ্ট্রপতি মো. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নিজেকে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। রাজনৈতিক সহিংসতা চরমে পৌঁছালে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করা হয়।
এরপর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়, প্রধান উপদেষ্টা হন ফখরুদ্দীন আহমদ। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হয় এবং নতুন কমিশনের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়। তবে মানুষের মনে সংশয় তখনও কাটেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল দীর্ঘদিন।
২০০৭ সালের ১৫ জুলাই ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপ জানায়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হবে। কিন্তু এর পরদিনই শেখ হাসিনার গ্রেপ্তার এবং কয়েক মাস পর খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীকে বিশেষ কারাগারে রাখা হয়, পরে ২০০৮ সালে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনের সংলাপ, বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বিতর্কের মধ্য দিয়ে অবশেষে নির্বাচনের পথ পরিষ্কার হয়। নভেম্বর মাসে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে ভোটের তারিখ পিছিয়ে নির্ধারিত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর।
সে দিন অনুষ্ঠিত হয় দীর্ঘদিন পর প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হয়, বড় ধরনের সহিংসতা দেখা যায়নি। তবে নির্বাচন পুরোপুরি প্রশ্নাতীতও ছিল না। অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, নির্বাচনের পর বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।
তবু ভোটের পরিসংখ্যান ছিল নজরকাড়া। বৈধ ভোটের হার দাঁড়ায় ৮৬ দশমিক ২৯ শতাংশে, যা আগের আটটি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ২৩০টি আসন, বিএনপি পায় ৩০টি আসন। চারদলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুটি আসনে জয়ী হয়।
এর পরের ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো একতরফা ভোট, রাতের ভোট বা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনের তকমা পায়। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটাই—ভবিষ্যতে যেন নির্বাচন নিয়ে আর সংশয় না থাকে, যেন ভোট সত্যিকার অর্থেই জনগণের মতামতের প্রতিফলন হয়।
সিএ/এমই


